খুলনায় ভয়ঙ্কর এক জালিয়াতি ও প্রতারণার শিকার নিজ পরিবার এবং হিমশিম খাচ্ছে প্রচন্ড বিভ্রান্ত খুলনার প্রশাসন

বিশেষ প্রতিনিধি
বাবা মায়ের সাক্ষর জাল করে সম্পতি দখল। মা, ভাই এবং বোনকে মারধর, বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাদের নামে ভুয়া অভিযোগ দিয়ে হয়রানী করার মাধ্যমে নিজেকে মহা ক্ষমতাধর হিসেবে প্রমান করে প্রতারণা চালিয়ে যাওয়াই তার প্রধান কাজ।
প্রতারক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, বয়স ৪৬ , পিতা-মৃত এম এ কুদ্দুস, মাতা-হোসনে আরা বেগম, ঠিকানা-৪৮ /১ মিউনিসিপাল ট্যাংক রোড, এপি হোল্ডিং নং ৫০, আউটার বাইপাস রোড, সায়রা স্বরনী প্রবেশ মুখে হোটেল পুষ্প বিলাস। পুলিশের খাতায় এভাবেই তার বিস্তারিত ঠিকানা উল্লেখ করা রয়েছে। একটা সময়ে চাকুরী করতেন নৌ বাহিনীতে। লেঃ কমান্ডার পর্যন্ত পৌছেছিলেন। এর পর অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অপরাধে ২০১৯ সালে নৌবাহিনী থেকে চাকুরিচ্যুত হন।
নৌ-বাহিনী থেকে চাকুরীচুত্য হয়েই মুলত বেপরোয়া হয়ে ওঠেন আব্দুল্লাহ আল মাসুদ। শুরু করেন প্রতারণার কারবার। সামরিক-বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিচারক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে দপ্তরে নামে-বেনামে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে হয়রানি করাই তার এখন প্রধান কাজ ।
মাসুদ প্রথমেই প্রতারণা শুরু করেন নিজ পরিবারের সদস্যদের সাথে। ভাই বোন সকলকে বঞ্চিত করে বাবার সম্পতি দখলের উদ্দেশ্যে তৈরী করেন একটি ভুয়া সমঝোতা পত্র। সোনাডাঙ্গার সেই সম্পতিটি দখলের জন্য বাবা এবং মায়ের সাক্ষর জাল করেন মাসুদ। যে স্ট্যাম্পে বাবা মায়ের সাক্ষর জাল করে সমঝোতা চুক্তিপত্র তৈরী করেছে, সেই তিনটি জুডিসিয়াল স্ট্যাম্প সিরিয়াল নম্বর (কষ ১৮৯৩৮০৮, কষ ১৮৯৩৮০৯ এবং কষ ১৮৯৩৮১০), খুলনা ট্রেজারিতে এসেছে ০৪/০২/২০২০ তারিখে, স্ট্যাম্প ভেন্ডার খন্দকার মুনির হোসেনের কাছে। সেখান থেকে আব্দুল্লাহ আল মাসুদ স্ট্যাম্প তিনটি ক্রয় করে ০৪/০৩/২০ তারিখে। অপরদিকে সেই জাল সমঝোতা চুক্তিপত্র তৈরী হয়েছে স্ট্যাম্প কেনার আরো দুই মাস আগে ০১/০১/২০২০ তারিখে। বিষয়টি নিয়ে মাসুদের ভাই থানায় মামলা হলে পুলিশ তদন্ত করে সত্যতা পায়। সেখানে বাবা মায়ের সাক্ষর জাল করা হয়েছে বলে প্রমানিত হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে মাসুদ ।
নিজেকে বাচাতে সে তার ভাই বোনের নামে ভুয়া অভিযোগ পাঠাতে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে। তার বোন মিনারা নাজমিন, বোনের স্বামি নুরুল করিম ভুইয়া দুই জনেই সরকারি কর্মকর্তা, ভাই আব্দুল্লাহ আল মামুন মেরিন ইঞ্জিনিয়র। তাদের সবাইকে জড়িয়ে নানা কাল্পনিক অভিযোগ পাঠাতে শুরু করেন বিভিন্ন জায়গায়। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা সেই কাল্পনিক কোন অভিযোগের সত্যতা খুজে না পাওয়ায় প্রতারক মাসুদ বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং প্রশাসনকে বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে সুবিধা করতে না পেরে অভিযোগ আনে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই। ভাই বোনদের দায়ের করা মামলায় মাসুদ প্রায় তিন মাস জেল খাটে। এরপর জেল থেকে বেরিয়ে সে আরো বেপরয়ো হয়ে যায়। আপন ছোটভাই ও তার মায়ের ফ্লাটে ডাকাতির নাটক সাজিয়ে মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। মাকে ব্যাপক মারধোর করে। ভাই বোনদের বিরুদ্ধে খুলনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে নানা কল্পিত অভিযোগ উত্থাপন করে।
মাসুদ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার নাম ব্যবহার করে খুলনার সাবেক পুলিশ কমিশনার জুলফিকার আলীকে প্রভাবিত করতে নানাভাবে হুমকি ধমকি ও ভয়ভীতি দেখায় । এক পর্যায়ে সে জুলফিকার আলীর বিরুদ্ধে আদালতে মিথ্যা মামলা দায়ের করে। একই কান্ড ঘটিয়ে ছিলো সোনাডাঙ্গা থানার তৎকালীন ওসি কবির হোসেন এবং এসির বিরুদ্ধেও। মাসুদের অন্যায় আবদার না শোনার কারনে তারাও মিথ্যা মামলার শিকার হন।
খুলনার সাবেক বিভাগীয় কমিশনার ফিরোজ সরকারের বিরুদ্ধে ডিজিএফআইএর উধ্বর্তন কর্মকর্তার কাছে মিথ্যা অভিযোগ করে তাকে হয়রানি করে।
মহানগর দায়রা জজ মির্জা হোসেন হায়দারের বিরুদ্ধে আইন উপদেষ্টা বরাবর মিথ্যা অভিযোগ দাখিল করে তাকে হয়রানী করেছে।
অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আনিচুর রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেয় সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রার জেনারেল এর কাছে। খুলনার যুগ্ম জেলা জজ খোরশেদুল আলমের বিরুদ্ধে আইন মন্ত্রণালয়ে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেছে।
কেসিসির রাজস্ব কর্মকর্তা বুশরা ইসলাম সহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়ে তার অবৈধ ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের জন্য চাপ প্রয়োগ করে। তার চাপে নতি স্বীকার না করায় বুশরার বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে।
তার অবৈধ লাইসেন্স এবং ভুয়া কাগজ পত্র ব্যবহার করে তিনি সেনাকল্যাণ সংস্থার নিলামে অংশ নিয়ে হোটেল টাইগার গার্ডেন ২০০ কোটির বিনিময়ে ক্রয় করার কার্যাদেশ গ্রহণ করে জালিয়াতি কারবারি মাসুদ। সেনা কল্যাণ সংস্থা বিষয়টি জানার পর সে কার্যাদেশ স্থগিত ঘোষণা করে ।
প্রতারক মাসুদ বিভিন্ন নাম ব্যবহার করে সরকারি দপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ফোন করতো। বিশেষ করে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সামরিক উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাফিজ উদ্দিন আহমেদের নাম , কখনো দুদকের সাবেক কমিশনার ব্রিগেডিয়ার হাফিজ উদ্দিনের নাম, আবার কখনো কখনো সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে চাপ প্রয়োগ করতো।
অপরিচিত অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে তা প্রচারের ব্যবস্থা করে সেগুলো আবার বিভিন্ন সরকারী দপ্তরে জমা দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ দাখিল করছে। সে সব লিংক আবার সরকারের মন্ত্রী এমপিদের হোয়াটস অ্যপে পাঠিয়ে দিচ্ছে। একই সাথে ফোন করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আবদার করছে।
প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে কখনো আব্দুল্লাহ আল মাসুদ , কখনো লেঃ কমান্ডার আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, কখনো আলী আহাসান নামে অভিযোগ করে। এসব অভিযোগ মিথ্যা প্রমান হলে পুনরায় নাম পরিবর্তণ করে ফের একই অভিযোগ জমা দেয়। উদ্দেশ্য থাকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হয়রানী করে যাওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *