হরিপুর সীমান্তের অমানবিক দৃশ্য: কাঁটাতার ও আইনি মারপ্যাঁচে আর কত বিপন্ন হবে মানবতা?

জসীমউদ্দিন ইতি ঠাকুরগাঁও।

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশব্যাকের (জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার) চেষ্টা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দৃঢ়তার সাথে প্রতিহত করেছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে বিজিবির এই তাত্ক্ষণিক ও অনমনীয় অবস্থান নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু এই আইনি, কৌশলগত ও ভৌগোলিক টানাপোড়েনের আড়ালে যে চরম ও নির্মম মানবিক বিপর্যয়টি উন্মোচিত হয়েছে, তা কোনো সভ্য সমাজের পক্ষে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দুই দেশের মধ্যবর্তী ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’ বা জিরো পয়েন্টে খোলা আকাশের নিচে নারী ও শিশুসহ ১১ জন মানুষের আটকে পড়ার ঘটনা আমাদের সামগ্রিক মানবতাবোধকে এক বিরাট প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তীব্র খাদ্য ও পানির অভাব এবং চিকিৎসাহীনতায় তাঁদের এই মানবেতর জীবনযাপন একটি গভীর মানবিক সংকটের জ্বলন্ত দলিল।

স্থানীয় ও সীমান্ত সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার সকালে মশালগাঁও সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতের অভ্যন্তর থেকে একদল মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বিজিবির সতর্ক পাহারায় সেই অপচেষ্টা ব্যর্থ হলেও, চূড়ান্ত বিচারে এই অসহায় মানুষগুলো এখন এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভাগ্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অনমনীয় অবস্থানের কারণে তাঁরা কোনো দেশের ভেতরেই প্রবেশ করতে পারছেন না। ফলে জিরো পয়েন্টের খোলা মাঠই এখন তাঁদের একমাত্র ঠিকানা। প্রশ্ন হলো, আধুনিক ও সভ্য দুনিয়ায় কাঁটাতারের বেড়া আর দুই রাষ্ট্রের আইনি মারপ্যাঁচে পড়ে মানুষ কেন এভাবে মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে? বিশেষ করে, এই দলটির মধ্যে যখন বেশ কয়েকটি অবোধ শিশু এবং একজন বিশেষ যত্নপ্রয়োজনী অন্তঃসত্ত্বা নারী রয়েছেন, তখন এই সংকট আর কেবল সাধারণ সীমান্ত বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা রূপ নেয় চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সুদীর্ঘ সীমান্তজুড়ে সৌহার্দ্য, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এবং গভীর বন্ধুত্বের কথা প্রায়শই উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক টেবিলে উচ্চারিত হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে বিএসএফের এমন একতরফা পুশব্যাকের চেষ্টা সেই বন্ধুত্বের সুরকে বারবার ম্লান করে দেয়। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা অনুযায়ী, যেকোনো মানুষেরই ন্যূনতম মানবিক অধিকার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। যদি এই মানুষগুলো অবৈধ অনুপ্রবেশকারীও হয়ে থাকেন, তবে তাঁদের সাথে আচরণ করার সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক নিয়ম ও আইনি ফ্রেমওয়ার্ক রয়েছে। পুশব্যাকের মতো জোরপূর্বক ও অমানবিক প্রক্রিয়ার আশ্রয় না নিয়ে, দুই দেশের বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করাটাই ছিল যুক্তিযুক্ত ও ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বারবার সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এমন একতরফা ও অমানবিক বলপ্রয়োগের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বর্তমানে মশালগাঁও সীমান্তের জিরো পয়েন্টে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। খোলা আকাশের নিচে প্রখর রোদ ও আকস্মিক বৃষ্টির মধ্যে দিন-রাত পার করছেন এই অসহায় মানুষগুলো। বিশেষ করে শিশু এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়ে সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে তাঁদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং জীবনরক্ষাকারী প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা না হলে, যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় বা জীবনহানির মতো ঘটনা ঘটতে পারে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে দাঁড়িয়ে প্রতিবেশীর এমন অমানবিক আচরণ যেমন মেনে নেওয়া যায় না, তেমনি চোখের সামনে একদল মানুষকে ধুঁকে ধুঁকে মরতে দেখাও মানবতার চরম অবমাননা।

আমরা মনে করি, এই সংকটের দ্রুত, নিরাপদ এবং সম্মানজনক সমাধান অতি জরুরি। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) মধ্যে কোম্পানি বা ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে যে পতাকা বৈঠকের প্রক্রিয়া চলছে, তা যেন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বা কাগুজে আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে। এই আলোচনার টেবিলে মানবিক দিকটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই মানুষদের প্রকৃত পরিচয় ও নাগরিকত্ব দ্রুত যাচাই করে তাঁদের স্থায়ী ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে, যতক্ষণ না পর্যন্ত কোনো কূটনৈতিক বা স্থায়ী সমাধান আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সীমান্ত আইনের ফাঁক গলে মানবিকতার খাতিরে—বিশেষ করে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীর জীবন রক্ষার্থে—জরুরি মানবিক সহায়তা ও প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা দুই দেশেরই দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের নৈতিক কর্তব্য।

সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষা করা যেমন প্রতিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম দায়িত্ব, ঠিক তেমনি বিপন্ন মানুষের জীবন রক্ষা করাও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। মশালগাঁও সীমান্তের এই মানবিক ও জীবন-মরণ অনিশ্চয়তা কাটাতে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক ও নীতি-নির্ধারণী মহল অতি দ্রুত হস্তক্ষেপ করবে এবং একটি স্থায়ী ও মানবিক সমাধানে পৌঁছাবে—এটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা। কোনো আইনি জটিলতা যেন মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে না ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *