ঢাকায় ডেকে হত্যা, কার্টনে লাশ—রাকিবের শেষ ঠিকানা নীলফামারীর সুপারি বাগান

সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক:
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় এসেছিলেন ১৭ বছরের রাকিবুল ইসলাম। স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। কিন্তু পরিচিত এক যুবকের ফোনে শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে গিয়ে আর ফেরেননি তিনি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে হত্যা করা হয়। এরপর কার্টনে ভরে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় নীলফামারীর ডিমলায়। মুক্তিপণের নামে পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া হয় ৪ লাখ টাকা।

এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে কাফরুল থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয়েছে আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকার (২৪) নামে এক যুবককে। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নীলফামারীর ডিমলার একটি সুপারি বাগান থেকে কার্টনে ভরা অবস্থায় রাকিবুলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

বুধবার বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির ক্রাইম প্রিভেনশন উত্তর বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম।

কোচিং করতে ঢাকায়, এরপর নিখোঁজ : এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে প্রায় এক মাস আগে টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় আসেন রাকিবুল ইসলাম। থাকতেন শেওড়াপাড়ার একটি মেসে। ফার্মগেটের একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।

পুলিশ জানায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে রাকিবুলের হোয়াটসঅ্যাপে একটি ফোন আসে। ফোনে কথা বলার পর তাঁকে শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে যেতে বলা হয়। সেখানে যাওয়ার পর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় শুক্রাবাদের একটি বাসায়। এরপর থেকেই নিখোঁজ হয়ে যান রাকিবুল। মুক্তিপণের ফোন, পরিবারের কাছে ১৫ লাখ টাকা দাবি

রাকিবুল নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর পরিবারের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাঁকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। সন্তানকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে চারটি বিকাশ ও তিনটি নগদ নম্বরে মোট ৪ লাখ টাকা পাঠান। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও রাকিবুলকে ফেরত দেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি আরও সন্দেহজনক হয়ে উঠলে তাঁর বড় ভাই জহুরুল ইসলাম ঢাকায় এসে কাফরুল থানায় রাকিবুল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সেই জিডির সূত্র ধরেই তদন্ত শুরু করে পুলিশ।

হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরেই মিলল হত্যার সূত্র: তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, রাকিবুলের পরিবারের কাছে মুক্তিপণের দাবি করা দুটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ব্যবহার করছিলেন আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকার। গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় শুক্রাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাঁকে আটক করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে রাকিবুলকে হত্যার কথা স্বীকার করেন মামুন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস আগে অনলাইনে রাকিবুলের সঙ্গে মামুনের পরিচয় হয়। মামুন একটি মার্কেটিং কোম্পানিতে চাকরি করেন। ঢাকায় আসার পর রাকিবুল একাধিকবার তাঁর বাসায়ও গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ১৬ সেপ্টেম্বর মামুনের বাসায় যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।

ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে মৃত্যু: পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে মামুন জানান, সেদিন বাসায় যাওয়ার পর রাকিবুলকে মারধর করা হয় এবং মুক্তিপণের টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এ সময় ঘাড় মটকে রাকিবুলের মৃত্যু হয় বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেন মামুন। রাকিবুল মারা যাওয়ার পর ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে মরদেহ গুম করার পরিকল্পনা করেন তিনি। একই সঙ্গে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণের টাকা আদায় অব্যাহত রাখেন।

কার্টনে ভরে লাশ, যেন বোঝার উপায়ই না থাকে: মরদেহ গুম করার জন্য রাকিবুলের লাশ একটি কার্টনের মধ্যে ঢোকানো হয়। এরপর কার্টনটি কসটেপ দিয়ে এমনভাবে মুড়িয়ে ফেলা হয়, যাতে বাইরে থেকে সেটির ভেতরে মরদেহ রয়েছে—তা বোঝার কোনো উপায় না থাকে।

পুলিশ জানায়, বাড়ির দারোয়ানের সহায়তায় কার্টনটি অটোরিকশায় করে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান মামুন। সেখান থেকে বাস ও অন্যান্য যানবাহনে করে নীলফামারীর ডিমলায় নিজের বাড়ির এলাকায় চলে যান তিনি। পরদিন, ১৭ সেপ্টেম্বর রাতের আঁধারে বাড়ির সামনের একটি সুপারি বাগানে গর্ত খোঁড়েন মামুন। পরে কার্টনসহ রাকিবুলের মরদেহ সেখানে মাটিচাপা দেন।

অবশেষে মিলল রাকিবের মরদেহ: মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৬ অক্টোবর বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ডিমলা থানা পুলিশের সহায়তায় ওই সুপারি বাগানে অভিযান চালায় পুলিশ। মামুনের দেখানো স্থান খুঁড়ে কার্টনের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় রাকিবুলের মরদেহ। পরে তাঁর বড় ভাই জহুরুল ইসলাম মরদেহটি শনাক্ত করেন। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ৪ লাখ টাকার মধ্যে উদ্ধার ৫০ হাজার পুলিশ জানিয়েছে, রাকিবুলের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণের নামে নেওয়া ৪ লাখ টাকার মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। মামুন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চাওয়ায় তাঁকে বুধবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ বলছে, এই হত্যাকাণ্ডে আর কেউ জড়িত কি না, মুক্তিপণের টাকা কোথায় ও কীভাবে লেনদেন হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন রাকিবুল। কিন্তু সেই স্বপ্ন থেমে গেল একটি ফোনকলের পর। পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণের টাকা নেওয়ার পরও তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত একটি কার্টনের ভেতর তাঁর লাশের সন্ধান মিলল শত শত কিলোমিটার দূরে নীলফামারীর একটি সুপারি বাগানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *