বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি এলাকায় কৃষিজমিতে বহুতল ভবন নির্মাণ : অভিযোগে ২২ কর্মকর্তা-কর্মচারী

এম.ইসলাম,পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধিঃ
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উত্তর দিকে হামিদপুর ইউনিয়নের বাঁশপুকুর, কাজীপাড়া ও চৌহাটি গ্রামে সারি সারি বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে রাজধানী ঢাকা কিংবা কোনো বড় শহরের আবাসিক এলাকা। বাস্তবে এসব ভবন দাঁড়িয়ে আছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমির মাঝখানে।
ভবনগুলোর বেশির ভাগই জনশূন্য ও তালাবদ্ধ। নেই বিদ্যুৎ সংযোগ, নেই যাতায়াতের উপযোগী রাস্তা; জমির আল ধরে হেঁটে সেখানে যেতে হয়। এর মধ্যেও থেমে নেই নির্মাণকাজ—প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ভবন তৈরি হচ্ছে।

কৃষিজমিতে নিয়মবহির্ভূত নির্মাণ :
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সম্প্রসারণের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কৃষিজমি ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণের হিড়িক শুরু হয়েছে। খনির জন্য জমি অধিগ্রহণ হলে অধিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় অনুমোদন ছাড়াই নিয়মবহির্ভূতভাবে এসব ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিল্ডিং কোড, নকশা অনুমোদন ও নিরাপত্তাবিধি উপেক্ষা করে ইতোমধ্যে তিন থেকে চারতলা বিশিষ্ট দুই শতাধিক ভবন নির্মিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির অসাধু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী বেনামে বা দালালের মাধ্যমে এসব নির্মাণকাজে অর্থ বিনিয়োগ করছেন। বাড়ির মালিকদের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর আন্দোলনের নেতা, বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় প্রভাবশালীরাও রয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠেছে।

সরেজমিনে যা দেখা গেল :
সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ ফসলি জমির মাঝখানে অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনের চারপাশে নেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পাকা রাস্তা বা অন্য কোনো নাগরিক সুবিধা।
বাঁশপুকুর ও কাজীপাড়া গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা বলেন, “তিনতলা ও চারতলা ভবনের অধিকাংশেই কেউ থাকে না। শুধু ক্ষতিপূরণের আশায় ভবন তৈরি করে রাখা হয়েছে। সরকার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করুক।”
এলাকায় সংবাদকর্মী বা অপরিচিত কেউ ছবি বা ভিডিও ধারণ করতে গেলে বাধার মুখে পড়তে হয় বলেও স্থানীয়রা জানান।

অনুমোদনের প্রশ্নে ধোঁয়াশা :
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিন-চারতলা ভবন নির্মাণে পার্বতীপুর উপজেলা ইমারত ভবন নকশা কমিটি ও হামিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি প্রয়োজন। উপজেলা ইমারত ভবন নকশা কমিটির সদস্যরা হলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রকৌশলী, ডিপ্লোমা প্রকৌশলী, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান।
তবে উপজেলা ইমারত ভবন নকশা কমিটির দাবি, এসব ভবন নির্মাণের বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। অন্যদিকে হামিদপুর ইউনিয়ন পরিষদ জানিয়েছে, ২০২৪ সালে সীমিত আকারে কিছু অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, এরপর আর কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।

খনি সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তের পরই নির্মাণ বৃদ্ধি :
১৯৮৫ সালে বড়পুকুরিয়ায় কয়লা খনি আবিষ্কারের পর এ পর্যন্ত খনির জন্য ৭৯২ দশমিক ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। খনি সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর উত্তর দিকে আরও ৩০০ একর এবং ২০২৬ সালের ২০ মে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে আরও ১ দশমিক ৩৬ একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএমসিএল)।
জমি অধিগ্রহণের আগে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতে ৫০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এই খবর প্রকাশের পর থেকেই উত্তরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে কৃষিজমিতে ভবন নির্মাণ বেড়ে যায় বলে স্থানীয়দের দাবি।

প্রশাসনের পরিদর্শনে বাধা :
সম্প্রতি কৃষিজমিতে নিয়মবহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগ তদন্তে খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু তালেব ফারাজী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. জানে আলমসহ জেলা প্রশাসন ও খনির কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শনে যান। এ সময় ড্রোনে ছবি ও ভিডিও ধারণের চেষ্টা করা হলে ভবন মালিকদের বাধার মুখে তা সম্ভব হয়নি।

রাজমিস্ত্রির বক্তব্য :
চলমান একটি নির্মাণকাজে কর্মরত এক রাজমিস্ত্রি জানান, প্রায় ৩০ শতক জমির ওপর একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে এবং ভবনটির মালিক কয়লা খনির একজন কর্মকর্তা।

২২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভবনের তথ্য :
পার্বতীপুর উপজেলা প্রশাসনের দাবি, সাম্প্রতিক জরিপে খনির ২২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভবনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। স্থানীয় দালালচক্রের সহায়তায় এসব বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির মহাব্যবস্থাপক (সারফেস অপারেশন) আবুল কালাম মুহাম্মদ বদরুল আলমের বিরুদ্ধে কয়েকটি ভবন ও গুদামঘর নির্মাণের অভিযোগ ওঠে। তিনি মোবাইল ফোনে বলেন, “আমি কোনো বিল্ডিং বা গুদাম করিনি। আমার স্ত্রীর নামে ওই এলাকায় জমি ছিল, সেখানে তার নামে একটি গুদামঘর রয়েছে।”

ইউপি চেয়ারম্যানের বক্তব্য :
হামিদপুর ইউপি চেয়ারম্যান রেজওয়ানুল হক বলেন, “ভবন নির্মাণে অনুমতি প্রয়োজন হলেও গ্রামের মানুষ অনেক সময় তা মানেন না। বর্তমানে তিন-চারতলা ভবনের অনুমোদন উপজেলা কমিটির মাধ্যমে দেওয়া হয়।” তিনি জানান, বাঁশপুকুর ও কাজীপাড়া গ্রামে প্রায় ১৫০টি এবং চৌহাটি মৌজায় প্রায় ৫০টি ভবন নির্মাণ হয়েছে। মোট প্রায় ২০০টি ভবনের মধ্যে মাত্র ৪০-৫০টির হোল্ডিং রয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে এ ধরনের নির্মাণকাজ চলছে।
হামিদপুর ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জাহেদুজ্জামান বলেন, ইউনিয়নের ২৮টি মৌজায় ৯ হাজার ৫০২ একর কৃষিজমি রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৩ একর অকৃষি জমি। বহুতল ভবন নির্মাণের ফলে কৃষিজমি দ্রুত কমে যাচ্ছে।

প্রশাসনের অবস্থান :
পার্বতীপুর উপজেলা প্রকৌশলী ও ইমারত ভবন নকশা কমিটির সদস্য মো. মানিক মিঞা বলেন, বাঁশপুকুর, কাজীপাড়া ও চৌহাটি এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতির জন্য এখন পর্যন্ত কেউ আবেদন করেননি। বর্তমানে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
পার্বতীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মাহমুদ হুসাইন রাজু বলেন, “এলাকাবাসীর কাছ থেকে বহু অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিল্ডিং কোড না মেনেই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ওই এলাকার খাজনা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।”

স্থানীয়দের দাবি, সরকার যেন নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের চিহ্নিত করে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করে এবং কৃষিজমি রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *