বটিয়াঘাটায় গোবিন্দ বাড়ৈ মৃত্যু না হত্যা? জনমনে আলামত নষ্টের আশঙ্কা, প্রশাসন পারবে কি প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে?

সেখ রাসেল, বিভাগীয় ব্যুরো চিফ, খুলনা:
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলা সদর ইউনিয়নের সিলিন্দামারী এলাকায় গোবিন্দ বাড়ৈ (৫৫) নিহত হয়েছে ১৬/০৯/২০২৬ তারিখ সন্ধ্যা অনুমান ৭ টা থেকে ৭:২০ টার মধ্যে, এ নিয়ে নিহতের স্ত্রী পলি মল্লিক বাদী হয়ে গত ১৭/০৯/২০২৬ তারিখ মামলা দায়ের করেছে, বটিয়াঘাটা থানায়। যার মামলা নং ৬।
মামলা ১০ দিন অতিবাহিত হলেও প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি প্রশাসন। দিন যতই গড়াচ্ছে ততই সন্দেহের দানা বাধছে জনমনে। এখন জনমনে একটাই প্রশ্ন লাশ যখন দ্রুত দাহের অনুমতি পেয়েছে, তখন ময়না তদন্তও উলটিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা।
তবে জনগণের নানান কথায় কান না দিয়ে প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের প্রয়োজনে পোস্ট মটেম ও আইনের উপর শ্রদ্ধা রেখেই আগানো উচিত।
ঘটনার পর সন্দেহভাজন হিসেবে তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তৎক্ষনাত মামলা না হওয়ায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে জানা গেছে প্রশাসন তাদেরকে সার্বক্ষনিক নজরে রেখেছেন। ফলে গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যু স্বাভাবিক, নাকি দুর্ঘটনা বা হত্যাকাণ্ড—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
তবে মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে শুরু থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের বক্তব্যে মরদেহে আঘাতের চিহ্ন, মাথায় কোপের দাগ এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে সন্দেহজনক আলামতের কথা উঠে এসেছে। এসব তথ্যের সত্যতা অবশ্য ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
আলামত সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন :
ঘটনাস্থল ও গোবিন্দ বাড়ৈর বাড়িকে ঘিরেও উঠেছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ,হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দশ দিন যেতে না যেতেই অল্প সময়ের মধ্যেই বাড়িতে লাগানো পাঁচ লক্ষাধিক টাকার বিভিন্ন গাছ কেটে ফেলা এবং রান্নাঘরের ঝুপড়ি/ঘর ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হয়। এর পেছনে মৃতের সৎকারের খরচ বা পারিবারিক প্রয়োজনের কথা বলা হলেও তদন্তের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব স্থাপনা ও বস্তু ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, তা আগে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না—সে প্রশ্নও উঠেছে।
কোনো অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বস্তু বা আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তদন্তের স্বার্থে তা সংরক্ষণ ও জব্দ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে অপরাধের আলামত গোপন বা নষ্ট করে অপরাধীকে আইনি শাস্তি থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কাজ করার বিষয়টিও দণ্ডনীয় হিসেবে উল্লেখ আছে।
সন্দেহের তালিকায় কয়েকজন, তবে প্রমাণের অপেক্ষা:
মৃত গোবিন্দ বাড়ৈর একমাত্র মেয়ে পূর্বাকে ঘিরেও স্থানীয়ভাবে নানা আলোচনা রয়েছে। পূর্বা বাড়ৈ এর সাথে কার কার সাথে যোযোযোগ ছিলো, কি কারণে প্রতিবেশি বা আত্মীয় স্বজন বাদে তাদের সাথে ঘনিষ্টতা, নিহত হওয়ার কয়েকদিন পূর্বে নিহত ব্যক্তি বা তার পরিবার কার কার সাথে যোগাযোগ করেছে।
ঘটনাস্থলে কারা গিয়েছিলেন এবং মরদেহ উদ্ধারের আগে-পরে কী ঘটেছিল—এসব বিষয় মোবাইল ফোনের কললিস্ট, লোকেশন ডাটা, সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সন্দেহভাজন কয়েকজন ব্যক্তির মোবাইল লোকেশন যাচাই করছে প্রশাসন। এছাড়া পূর্বা বাড়ৈ ভিডিও সাক্ষাৎকারে বলেন, আমি বাবাকে অসুস্থ অবস্থায় ঘরে মশারির ভিতর রেখে ছিলিন্দামারী মোড়ে যাই এবং গাড়ি না পেয়ে ফিরে এসে পুকুর ঘাটে দেখি বাবা পড়ে আছে। কথাটি এজাহারের সাথে গড় মিল, পূর্বা বলেন, আমার বাবাকে পুকুর ঘাট থেকে একলাই ঘরে নিয়ে গেছি। সরে জমিনে গিয়ে দেখা যায় পুকুর ঘাট থেকে ঘরে বিছানার পর্যন্ত ৫০ ফুটের ঊর্ধ্বে এতখানি দূরত্বে পূর্বা একলা কিভাবেই নিহত/অচেতন ব্যক্তিকে টেনে নিয়ে গেলেন প্রশ্ন থেকে যায়? এছাড়া পুকুর ঘাট থেকে ৫০ ফিট টেনে আনার সময় কোন রক্ত না ঝরে কেনই বা খাটে রক্তের চিহ্ন।
জমি বিক্রির তথ্যও তদন্তের আওতায় আসছে: স্থানীয়ভাবে আরও দাবি করা হচ্ছে, গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুর প্রায় ২/৩ দিন আগে জমি বিক্রির একটি তথ্য পাওয়া গেছে। জমি বিক্রির সঙ্গে মৃত্যুর ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, কিংবা এটি সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিষয়—তা দলিল, রেজিস্ট্রি রেকর্ড, লেনদেনের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করলেই স্পষ্ট হতে পারে।
ময়নাতদন্তের রিপোর্টই গুরুত্বপূর্ণ: এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল। তবে তা নিয়েও চলছে আলোচনা সমালোচনা। সকলের একই প্রশ্ণ নিহত হওয়ার পরের দুদিন পর কিভাবে লাশ দাহের অনুমতি পেলো, এটি আলামত নষ্টের কোন ষড়যন্ত্র নয়তো।
মরদেহে আঘাতের চিহ্ন থাকলে তার ধরন, মৃত্যুর কারণ, মৃত্যুর আনুমানিক সময় এবং কোনো যৌন বা শারীরিক নির্যাতনের আলামত ছিল কি না—এসব বিষয়ে ময়নাতদন্ত ও প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন: গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্তকারীদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—
১. পূর্বা বাড়ৈর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি বাবাকে মশারির মধ্যে রেখে বের হওয়ার পর কীভাবে তিনি পুকুরঘাটে গিয়ে পড়ে ছিলেন?
২. তাকে উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলে কারা উপস্থিত ছিলেন?
৩. কন্যা পূর্বা বাড়ৈ কিভাবে একা ঘরে নিয়ে আসলেন? পুকুর ঘাট থেকে ঘর ৫০ ফুট উর্ধ্বে দুরত্ব কিন্তু পথে কোথাও রক্ত পাওয়া যায়নি। কিন্তু ঘরে খাটে রক্ত পাওয়া গেলো কেনো? ঘরের ভেতরে পাওয়া রক্তের দাগের উৎস ও প্রকৃতি কী?
৪. মরদেহে থাকা আঘাতের চিহ্ন কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে? ঘটনাস্থল ও বাড়িতে থাকা সম্ভাব্য আলামত সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি না?
৫. বাড়ির গাছ কাটা এবং রান্নাঘরের অংশ ভাঙার কাজ কখন, কারা এবং কী কারণে করেছে?
৬. সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ঘটনার সময়কার মোবাইল লোকেশন কী ছিল? নিহতের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ, বিরোধ, আর্থিক লেনদেন বা পূর্বপরিচয় ছিল কি না?
৭. তাদের সঙ্গে গোবিন্দ বাড়ৈ বা তার পরিবারের সদস্যদের কী ধরনের যোগাযোগ ছিল? নিহতের দিন কোথায় কোথায় গিছিলেন, কার কার সাথে যোগাযোগ হয়েছে বা তার আগে কারো সাথে কোন বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য বা কথা কাটাকাটি হয়েছে কিনা?
৮. জমি বিক্রির ঘটনাটি মৃত্যুর সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত কি না?
৯. ময়নাতদন্তে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, কোন চিকিৎসক করেছেন, ঐ চিকিৎসকের সাথে কার কার কোন বিষয়ে যোগাযোগ হয়েছে কিনা?
১০. ফরেনসিক পরীক্ষায় কোনো DNA, রক্ত বা অন্য আলামত পাওয়া গেছে কি না?
জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর গুজব বা অনুমান দিয়ে নয়, প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমেই বের করে আনতে হবে।
গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যু কি স্বাভাবিক? দুর্ঘটনা? নাকি এর পেছনে অপরাধের কোনো ঘটনা রয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তাধীন। আর সেই উত্তর যত দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিকভাবে বেরিয়ে আসবে, তত দ্রুতই দূর হবে স্থানীয় মানুষের আশঙ্কা ও সংশয়।
এখন তাই পরিবারের পাশাপাশি এলাকাবাসীরও প্রত্যাশা—তদন্ত যেন কোনো অনুমানকে সত্য ধরে নয়, বরং প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রমাণের মাধ্যমে খুঁজে বের করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *