ঠাকুরগাঁওয়ে ইএসডিও-র হাত ধরে ঘুরল প্রান্তিক আদিবাসী পরিবারের ভাগ্য
জসীমউদ্দিন ইতি ঠাকুরগাঁও।
একসময় যার নির্দিষ্ট কোনো ভিটেমাটি ছিল না, খাসজমিতে একটা ভাঙা ছাপড়া তুলে দিনমজুর স্বামীর সাথে চরম কষ্টে চলত সংসার—একদিন কাজ না পেলে যার ঘরে চুলা জ্বলত না, দুবেলা দুমুঠো ভাতের সংস্থান করাটাই যেখানে ছিল প্রতিদিনের যুদ্ধ, ঠাকুরগাঁওয়ের সেই আদিবাসী নারী আরতি মার্ডি আজ চরম দারিদ্র্যের অন্ধকার পেরিয়ে সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইকোলজিক্যাল সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-র নিবিড় দিকনির্দেশনা, সঠিক প্রশিক্ষণ ও সময়োপযোগী অর্থায়নে আজ তিনি প্রায় ১২ লাখ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের কহেরপাড়া গ্রামের আরতি মার্ডির এই অবিশ্বাস্য জীবনসংগ্রাম ও রূপান্তর কেবল একজন সাধারণ নারীর অর্জনের গল্প নয়; এটি প্রমাণ করে—প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীদের সঠিক সুযোগ, উপযুক্ত প্রযুক্তি ও কার্যকর অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে চরম দারিদ্র্যকেও স্থায়ীভাবে পরাস্ত করা সম্ভব।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও আরতি মার্ডির পরিবারের দিন কাটত প্রচণ্ড অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায়। সন্তানের পড়াশোনা তো দূরের কথা, দৈনিক খাদ্যের যোগান দিতেই হিমশিম খেতে হতো। তবে এই বিষাদময় চিত্র বদলাতে শুরু করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইএসডিও পরিচালিত ‘পাথওয়েজ টু প্রসপারিটি ফর এক্সট্রিমলি পুওর পিপল (পিপিইপিপি ইইউ)’ প্রকল্পের মাধ্যমে। ২০১৯ সালে এই সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার পর আরতিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
প্রকল্পের আওতায় তিনি শুধু আর্থিক সহায়তাই পাননি, বরং ধাপে ধাপে লাভ করেছেন ক্ষুদ্র সঞ্চয়, আয়বর্ধক কাজ, টেকসই কৃষি পদ্ধতি, হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু পালনের ওপর আধুনিক ও নিবিড় প্রশিক্ষণ। প্রাপ্ত আর্থিক অনুদান ও স্বল্প সুদের ঋণকে সঠিক পরিকল্পনায় সমন্বিত কৃষিতে বিনিয়োগ করেন তিনি। বর্তমানে গবাদি পশু পালন, হাঁস-মুরগির খামার এবং শাকসবজি ও ধানের বাণিজ্যিক চাষাবাদের মাধ্যমে তাঁর পরিবারের গড় মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। যে পরিবারে একসময় অনাহার ছিল নিত্যসঙ্গী, সেখানে আজ সন্তানদের সুশিক্ষা ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে।
আরতি মার্ডির এই অর্জনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—এর সুফল শুধু তাঁর নিজের চার দেয়ালের মাঝেই আটকে থাকেনি। তিনি আজ পুরো কহেরপাড়া ও আশপাশের পিছিয়ে পড়া আদিবাসী সম্প্রদায়ের নারীদের কাছে এক অনুপ্রেরণাদায়ী রোল মডেল। স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ‘প্রোস্পারিটি বনফুল ইকো গ্রাম কমিটি’ এবং ‘শাপলা ইকো গ্রাম কমিটি’র মাধ্যমে তিনি অন্যান্য প্রান্তিক নারীদের একত্রিত করছেন। তাঁদের মধ্যে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা, নিজেদের সামাজিক ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং আত্মকর্মসংস্থানের পথ দেখানোর কাজে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। এটি কেবল অর্থনৈতিক অগ্রগতি নয়, বরং গ্রামীণ সমাজ কাঠামোয় নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
সম্প্রতি বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরতি মার্ডির এই অনুকরণীয় সাফল্য উঠে আসার পর সুশীল সমাজ ও স্থানীয় নীতি-নির্ধারকদের মাঝে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া পড়েছে। অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের মূল অঙ্গীকার—ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও মূলধারার অর্থনীতিতে তাঁদের সরাসরি সম্পৃক্ত করা—এর বাস্তব উদাহরণ আরতি মার্ডির এই জীবনসংগ্রাম।
এই সফল রূপান্তরের আলোকে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন:
১. টেকসই প্রশিক্ষণ ও অব্যাহত তদারকি: সাময়িক বা এককালীন ত্রাণ দারিদ্র্য বিমোচনে স্থায়ী সমাধান আনে না। আরতি মার্ডির সাফল্য স্পষ্ট করেছে যে, সহায়তার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট কারিগরি দক্ষতা, নিয়মিত মনিটরিং ও মানসিক উদ্বুদ্ধকরণই দারিদ্র্য দূরীকরণে দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা রাখতে পারে।
২. সরকারি-বেসরকারি প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও সমাজসেবা কার্যালয়ের মতো স্থানীয় সরকারি দপ্তরগুলোর সাথে এনজিও উদ্যোগের মেলবন্ধন ঘটানো প্রয়োজন। সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও বেসরকারি প্রশিক্ষণ সমন্বিত হলে এ ধরনের প্রকল্পের কার্যকারিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
৩. প্রান্তিক অঞ্চলে ‘প্রসপারিটি মডেল’ সম্প্রসারণ: ঠাকুরগাঁওসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গ এবং দেশের অন্যান্য দুর্গম প্রান্তিক অঞ্চলের অসংখ্য পরিবার আজও চরম দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করছে। ইএসডিও-র এই সফল ‘পিপিইপিপি প্রসপারিটি মডেল’কে জাতীয় নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করে সরকারি উদ্যোগে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া দরকার।
প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা যখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হন, তখন শুধু একটি পরিবারই বদলায় না, বরং বদলে যায় পুরো গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক চিত্র। সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত যৌথ প্রয়াসে দেশের প্রতিটি পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে এমন হাজারো আরতি মার্ডির উত্থান ঘটুক—তবেই গড়ে উঠবে বৈষম্যহীন, সমৃদ্ধ ও টেকসই বাংলাদেশ।

