অবৈধ কারখানায় ব্যাটারি গলিয়ে সিসা উৎপাদন, হুমকিতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য
সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক:
টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার রক্তিপাড়া বাসস্ট্যান্ডের উত্তর পাশে পুরোনো ও ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি সংগ্রহ করে অনুমোদনহীনভাবে গলিয়ে সিসা বের করার অভিযোগ উঠেছে। জনবসতির কাছাকাছি এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার ফলে বিষাক্ত ধোঁয়া, দুর্গন্ধ ও দূষিত বর্জ্যে পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা পুরোনো ব্যাটারি কারখানার ভেতরে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। পরে এসব ব্যাটারি ভেঙে ও আগুনে গলিয়ে সিসা আলাদা করার প্রক্রিয়া চলছে। ব্যাটারি পোড়ানো ও গলানোর সময় কারখানা থেকে কালো ধোঁয়া ও তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। কারখানার আশপাশেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ব্যাটারির ভাঙা অংশ, অবশিষ্টাংশ ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এ কার্যক্রম চললেও এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে কার্যকর নজরদারি দেখা যাচ্ছে না। তাঁদের দাবি, আবাসিক এলাকা ও জনবসতির কাছাকাছি এ ধরনের কারখানা পরিচালনা বন্ধ করে বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন।
নিরাপত্তা ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শ্রমিকরা
কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের অনেককেই পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই ব্যাটারি ভাঙা ও গলানোর কাজে নিয়োজিত থাকতে দেখা গেছে। ফলে দীর্ঘ সময় বিষাক্ত ধোঁয়া ও সিসার সংস্পর্শে থাকলে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি থেকে সিসা পুনরুদ্ধার নিজেই একটি নিয়ন্ত্রিত শিল্পপ্রক্রিয়া। যথাযথ প্রযুক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এ কাজ করা হলে সিসা ও অন্যান্য দূষক বাতাস, মাটি ও পানিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে সিসা দূষণ উদ্বেগের বিষয়। দীর্ঘদিন সিসার সংস্পর্শে থাকলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে দূষিত বর্জ্য মাটি ও পানিতে মিশলে কৃষিজমি, জলাশয় এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন
কারখানার আশপাশে পড়ে থাকা ব্যাটারির অবশিষ্টাংশ ও অন্যান্য বর্জ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব বর্জ্য কীভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তি করা হচ্ছে—তা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, পুরোনো ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার পরিবেশের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও তা অবশ্যই অনুমোদিত ও পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে করতে হবে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাটারি গলিয়ে সিসা বের করার প্রক্রিয়া পরিবেশের পাশাপাশি শ্রমিক ও আশপাশের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত বিষয়টি তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কারখানাটির বৈধতা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে জনবসতির কাছাকাছি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—জনবসতির পাশে অনুমোদনহীনভাবে এমন ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম কতদিন চলবে? এখনই কার্যকর নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এর পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির দায় কে নেবে—এ প্রশ্নই সামনে এসেছে।

