মুন্সীরহাট বাজারে জেলা পরিষদের খাল দখল: সড়ক সংকুচিত, নিত্যদিনের যানজটে ভোগান্তি চরমে
মোঃ জাবেদ হোসেনঃচাঁদপুরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বাবুরহাট–মতলব পেন্নাই রোডের মুন্সীরহাট বাজার এলাকায় আবারও চাঁদপুর জেলা পরিষদের সরকারি খাল ও সংলগ্ন জায়গা দখল করে অবৈধভাবে দোকানপাট স্থাপনের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই দখলবাজি নতুন করে বিস্তৃত হওয়ায় বাজার এলাকায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এতে প্রতিদিনই কয়েক ঘণ্টা ধরে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে এবং চরম দুর্ভোগে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
সরে জমিনে দেখা গেছে, মুন্সীরহাট বাজারের সড়কের পশ্চিম পাশে জেলা পরিষদের খালের জায়গা ভরাট করে এবং তার ওপর আধা কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা জুড়ে অস্থায়ী ও স্থায়ী দোকানঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এসব দোকানে খোলা বাজার, সবজি, ফল, মাছ-মাংসসহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা জমজমাটভাবে চলছে। অনেক ক্ষেত্রে দোকানগুলো সড়কের গা ঘেঁষে এমনকি সড়কের ওপর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, ফলে রাস্তার কার্যকর প্রস্থ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এদিকে সড়কের দুই পাশে এলোমেলোভাবে অটোরিকশা, সিএনজি, ভ্যান ও পণ্যবাহী যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকায় যান চলাচল আরও ধীর হয়ে পড়ে। বাজারের ভেতরে পণ্য ওঠানামা, ক্রেতাদের ভিড় এবং দোকানদারদের দখলদারিত্ব মিলিয়ে পুরো এলাকায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে স্বাভাবিক সময়ে যেখানে সহজে চলাচল সম্ভব, সেখানে এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে পথচারী ও যাত্রীদের।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, “এখানে প্রতিদিনই যানজট লেগেই থাকে। বিশেষ করে সকাল ও বিকেলের ব্যস্ত সময়ে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ এমনকি রোগীবাহী গাড়িও এই জটে আটকে পড়ে।” অনেকেই অভিযোগ করেন, খালের জায়গা দখল করে দোকান বসানোর ফলে শুধু যানজটই নয়, বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, বাজার সম্প্রসারণের কারণে তারা বাধ্য হয়ে এভাবে দোকান বসিয়েছেন। তবে বেশিরভাগ সচেতন নাগরিক প্রশ্ন তুলেছেন—কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়া কীভাবে সরকারি জায়গা দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে? এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী একটি চক্রের ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এই দখল কার্যক্রম চলছে। মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে ব্যর্থ হয়েছে। উচ্ছেদের কিছুদিন পরই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় দখলকৃত এলাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক ও খাল দখল শুধু যানজটের কারণ নয়, এটি পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনার জন্যও বড় হুমকি। খাল ভরাট হয়ে গেলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। একইসঙ্গে সড়কের ওপর অবৈধ স্থাপনা থাকলে জরুরি সেবার যানবাহন দ্রুত চলাচল করতে পারে না, যা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। তারা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, খাল পুনরুদ্ধার এবং সড়ক দখলমুক্ত করে যান চলাচল স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে আবার দখল না হয়, সে জন্য নিয়মিত মনিটরিং ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সচেতন মহলের মতে, মুন্সীরহাট বাজারের এই সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে এ ভোগান্তি থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, মুন্সীরহাট বাজারের সড়কের পশ্চিম পার্শ্বে চাঁদপুর সদর উপজেলার আওতাধীন জেলা পরিষদের প্রায় আধা কিলোমিটার জায়গায় দোকান ঘর উত্তোলন করে বিভিন্ন ব্যবসা বানিজ্য পরিচালনা করে আসছেন স্থানীয়রা।
বিগত প্রায় দুই যুগে গড়ে উঠেছে দেড় শতাধিক দোকানঘর। তন্মোধ্যে রয়েছে খাবারের হোটেল, মিস্টির দোকান, মুদী দোকান,ফলের দোকান,কসমেটিকস দোকান,লাইব্রেরি, সেলুন,চা দোকান,মোবাইলের দোকানসহ অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। চা দোকান মালিক নুরুল ইসলাম, ফার্মেসির মালিক বশির উল্লাহ প্রধান, ভাই ভাই স্টোরের মালিক আব্দুর রহমান, ভাসান সেলুনের ভিটি মালিক ফয়সাল হাওলাদার, স্টীলের দোকান আব্দুর রশিদের ছেলে মুসলিম,প্রিন্স লন্ড্রির ভিটি মালিক মাইনুল ইসলামসহ আরো ১০ /১৫ জন দোকান মালিকদের নিকট জানতে চাইলে তারা বলেন,জেলা পরিষদে আবেদন করে লিজ নিয়ে আমরা দীর্ঘ কয়েক বছর যাবৎ ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি।কেউ কেউ বলেছেন আমরা প্রতি বছর জেলা পরিষদের অফিসে গিয়ে টাকা জমা দিয়েছি।তাই জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে আমাদের দোকান ঘর উচ্ছেদ করতে বহুবার নোটিশ দিয়েছেন। কিন্তু উচ্ছেদ করা হয়নি।
জেলা পরিষদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে অবৈধভাবে গড়ে উঠা স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য একাধিকবার নোটিশ করা হয়েছে। গত ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি তৎকালীন জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাবেক মিজানুর রহমানের স্বাক্ষরিত এক নোটিশ এর মাধ্যমে জানা যায় , জেলা পরিষদের মালিকানাধীন চাঁদপুর সদর উপজেলার ধনপুরদি মৌজার সাবেক ৪১২ হাল ২ নং খতিয়ানে সাবেক ৭৪৭ নং দাগে হাল১৫৬৩,১৫৬৪,১৫৬৫,১৭১৭,১৭১৮,১৭১৯ নং দাগে অবৈধভাবে জোরপূর্বক দখল করে দোকান ঘর নির্মাণ করে ব্যবসা পরিচালনা করছে প্রায় দেড় শতাধিক দোকান মালিক যা ফৌজদারি অপরাধ।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তৎকালীন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরো একটি নোটিশ হয় ওই দোকান মালিকদের। বারবার নোটিশ দেওয়া সত্বেও দোকান মালিকরা কর্ণপাত না করায় গত জুলাই মাসে জেলায় মাসিক সমন্বয় কমিটির সভায় মুন্সীরহাট বাজার এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠা স্থাপনাগুলো উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন সাবেক জেলা প্রশাসক। এছাড়া চলতি মাসের ২৫ আগস্ট নিজ দায়িত্বে তাদের দোকান ঘর ও মালামাল সরিয়ে নেওয়ার জন্য সর্বশেষ নোটিশ করে। পরে
এ ব্যাপারে মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলা পরিষদের সদস্য আমজাদ হোসেন বলেন,জেলা প্রশাসকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক মুন্সীরহাট বাজার এলাকায় সরকারি জায়গায় অবৈধভাবে যেসব স্থাপনা গড়ে উঠেছে সেগুলো তাদের নিজ দায়িত্বে সরিয়ে নেয়ার জন্য ২৫ আগস্ট পর্যম্ত সময় দেয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত অমান্য করা হলে তাদের দোকান ঘর উচ্ছেদ করা হবে। নোটিশের কথা অমান্য করার পরে অবৈধ দোকানগুলো উচ্ছেদ করা হয়।

