সচিবালয়ে নিরাপত্ত ঝুকি এড়িয়ে পাশবিহীন দশনার্থীর ভিড় দিন দিন বেড়েই চলেছে, কারা জড়িত

সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক:
বাংলাদেশ সচিবালয় রাষ্ট্রের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর (কেপিআই) একটি। তাই সচিবালয়ে ঢুকতে গেলে বিশেষ পাশের (অনুমতিপত্র) প্রয়োজন হয়। কিন্তু সীমিত সংখ্যক অনুমোদিত পাশ থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী সচিবালয়ে প্রবেশ করছেন। এই দর্শনার্থীরা বিভিন্ন তদবির বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সচিবদের একান্ত সচিবদের (পিএস) নাম ব্যবহার করে কিংবা তাদের রিকোয়েস্টে প্রবেশ করছেন। এছাড়া বড় একটা অংশ অনিয়মের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে ভেতরে ঢুকছেন, যা প্রশাসনিক এই এলাকার নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সচিবালয়ের মতো সর্বোচ্চ নিরাপত্তার জায়গায় ঢালাওভাবে দর্শনার্থী প্রবেশে প্রশাসনিক কার্যক্রম ও গোপনীয়তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। এরপর থেকে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে দর্শনার্থীর ভিড় কয়েক গুণ বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না বললেই চলে, এখন সেখানে রাজনৈতিক সরকারের আমলে মানুষের যাতায়াত বেড়েছে ব্যাপক হারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী জানা যায়, প্রতিদিন সচিবালয়ে স্থায়ী ও অস্থায়ী পাশ নিয়ে গড়ে প্রায় দেড় থেকে ২ হাজার মানুষ প্রবেশ করেন। দর্শনার্থী পাশ নিয়ে ঢোকেন আরো কয়েক হাজার। তাদের অধিকাংশ দালাল ও তদবিরবাজ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রীর পক্ষে তাদের একান্ত সচিবরা দৈনিক ১০টি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সিনিয়র সচিব এবং সচিবদের পক্ষে তাদের একান্ত সচিবরা পাঁচটি এবং অতিরিক্ত সচিবরা তিনটি করে দর্শনার্থী পাশ ইস্যু করতে পারেন। মূলত এই পাশ ইস্যুর অনুমতির সুযোগ নিয়েই অনেক দর্শনার্থী সচিবালয়ে ভিড় করেন। এর বাইরে সচিবালয়ের ভেতর থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের রিকোয়েস্টে প্রবেশ করেন অনেকে।
গত দুই দিন সচিবালয়ের দর্শনার্থী প্রবেশের ৬ নম্বর গেটে অবস্থান নিয়ে দেখা যায়, শত শত মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন অনুমতির অপেক্ষায়। সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা তাদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার ফোন সারাক্ষণ ব্যস্ত। একটার পর একটা ফোন আসছে, রিকোয়েস্ট আসছে। আবার ভেতরে ঢোকার অপেক্ষায় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শনার্থীদের অনেককেই দেখা যায়, সচিবালয়ের ভেতর থেকে কোনো কর্মকর্তার রিকোয়েস্টের ফোন দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তার কাছে কথা বলার জন্য ধরিয়ে দিয়ে বলছেন, ‘অমুক স্যার ফোন করেছেন, একটু কথা বলুন।’ কথা বলার পরই তাদের খাতায় নাম এন্ট্রি করে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
গতকাল সোমবার অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর সচিবালয়ে প্রবেশ করেন আব্দুল হালিম নামের এক ব্যক্তি। তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যাবেন। তিনি ময়মনসিংহের একটি এমপিওভুক্ত কলেজের প্রিন্সিপাল। কলেজের একটি সমস্যা নিয়ে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরির পর ভেতরে ঢুকেছেন। ঢুকলেন কীভাবে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, সচিবালয়ের গেটে ম্যানেজ করে ঢুকেছি। সঙ্গে এ-ও বললেন, টাকা দিলে সবই হয়। আব্দুল হালিমের মতো একই কৌশলে অনেক দর্শনার্থী এবং দালাল ও তদবিরবাজরা সচিবালয়ে কাউকে না কাউকে ‘ম্যানেজ’ করে প্রবেশ করেন।
দুই দিন আগে সরকারি একটি দপ্তরের এক কর্মকর্তা আসেন তার স্ত্রীর বদলির তদবির করতে। তিনি পুলিশের একজন এসআইকে ১ হাজার টাকা দিয়ে তার মোটরসাইকেলের পেছনে বসে সচিবালয়ে প্রবেশ করেন। আরেক জন ব্যবসায়ী জানালেন, পরিচিত একজন যুগ্মসচিবের সঙ্গে তার গাড়িতে চড়ে ভেতরে প্রবেশ করেছেন। গত কয়েক দিন সচিবালয় ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের একাধিক জুনিয়র কর্মকর্তা সচিবালয়ে দর্শনার্থী প্রবেশের জন্য গেটে স্লিপ পাঠাচ্ছেন। জুনিয়র কর্মকর্তাদের এমন স্লিপ বিধিভঙ্গের শামিল বলে মন্তব্য করেছেন দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীরা। এছাড়া অনেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব দর্শনার্থী প্রবেশের অনুমতির জন্য সচিবালয় নিরাপত্তা শাখার কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি পাঠান। এতে বিব্রত হচ্ছেন নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা। এ পরিস্থিতিতে দালালরাও প্রশ্রয় পাচ্ছে। আবার দর্শনার্থী হিসেবে সচিবালয়ের ভেতরে ঢুকে এসব ব্যক্তি নানামুখী তদবির আর আবদার নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন।
গত রবিবার একটি মন্ত্রণালয়ের একজন মন্ত্রীর কক্ষে পরিচয় দিয়ে প্রবেশ করতে চাইলে তার পিএস বাধা দেন এই প্রতিবেদককে। ভেতরে অনেক লোক আছে বলে এই প্রতিবেদককে অপেক্ষা করতে বলেন। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও সাড়া না পাওয়ায় প্রতিবেদক ভেতরে উঁকি মারতেই পরিচিত মন্ত্রী তাকে ভেতরে ঢোকার জন্য বলেন। ভেতরে ঢুকে মন্ত্রীকে কেমন আছেন, জিজ্ঞাসা করতেই তার (মন্ত্রী) রুমে অনেক মানুষকে দেখিয়ে বললেন, কেমন আছি দেখতেই তো পারছেন। কারও জন্য মনে হয় কিছু করতে পারছি না। মন্ত্রীকে তখন খুব বিরক্ত দেখাচ্ছিল।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নানা বিষয়ে তদবির করতে আসছেন সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন। এই তদবির পার্টির কারণে কোনো কোনো মন্ত্রী বিব্রতবোধ করছেন। একই কারণে কর্মকর্তারাও অস্বস্তি প্রকাশ করছেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত খালি তদবির। সেই সমস্ত তদবির হচ্ছে পোস্টিং-টোস্টিং নিয়ে।
সচিবালয়ে প্রতিদিন এত লোক নির্ধারিত পাশের বাইরে কীভাবে ঢুকছে, জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের কাছে ওপর থেকে এমন কিছু অনুরোধ আসে, না দিয়ে পারি না। বুঝেনই তো।’ এভাবে অননুমোদিত লোক ঢোকার কারণে সচিবালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভবনা আছে কি না, জবাবে তিনি বলেন, যেহেতু প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে নিয়মিত অফিস করছেন, সেহেতু এখানকার নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি নেই।
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা গণমাধ্যমকে বলেন, সচিবালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ কেপিআইভুক্ত এলাকা। এখানে যে কাউকে ফোনে বা রিকোয়েস্টে ঢুকতে দেওয়া উচিত নয়। নির্ধারিত কার্ডধারী এবং যাদের মন্ত্রণালয়ে ঢোকার প্রয়োজন, অনুমোদন সাপেক্ষে শুধু তারা ছাড়া এভাবে অবাধে লোকজন ভেতরে ঢুকলে সচিবালয়ের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অর্ডারে বেসরকারি স্কুলশিক্ষকদের বেতনের সরকারি অংশ পাওয়া শিক্ষকদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *