জ্বালানি তেলের ব্যারেল ছাড়াল ১১৫ ডলার
সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাাদক:
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তীব্রভাবে পড়তে শুরু করেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ করেই ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে এই বড় উল্লম্ফন দেখা যায়। সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দাঁড়িয়েছে ১১৫ দশমিক ৮৪ ডলার, যা আগের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা শুরুর আগে তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে দাম বাড়তে থাকে। গত ১৯ মার্চ তেলের দাম সর্বোচ্চ ১১৮ ডলারে পৌঁছায়। এরপর কিছুটা কমে গেলেও শুক্রবার পর্যন্ত তা ১১২ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছিল, যা যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত অব্যাহত থাকলে তেলের বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাত এবং তেল সরবরাহের প্রধান সমুদ্রপথগুলোতে অনিশ্চয়তার কারণেই বাজারে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে তেহরানও ইসরায়েলি ভূখণ্ড এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্য কার্যত এক ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এতে করে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বাড়ার পেছনে বড় কারণ হলো সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা। ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়ায় তাদের ওপর সামরিক চাপ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে তা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে। এদিকে লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতা এবং সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক হামলাগুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এসব কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে এবং তার প্রভাব সরাসরি তেলের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তেল উৎপাদন বা পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়, তাহলে আগামী দিনে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং তার প্রভাব পড়ে খাদ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দামের ওপর। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলো এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে। ফলে অনেক দেশের অর্থনীতি নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ওপেক প্লাস দেশগুলো উৎপাদন বাড়িয়ে বাজার স্থিতিশীল করার কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না, তা নিয়ে বিশ্ববাজারে ব্যাপক আলোচনা চলছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তেলের বাজারের এই অস্থিরতা সহজে কমবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

