শেরপুরে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার জমির ভাড়া না দিয়ে মালিকানা দাবির অভিযোগ, একাধিক মামলা ও তদন্তে বিতর্ক

শেরপুর জেলা ব্যুরো চিফ:
শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার বারারচর মৌজায় এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার ক্রয়কৃত জমির ভাড়া পরিশোধ না করে পরবর্তীতে সেই জমির মালিকানা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে এক ভাড়াটিয়ার বিরুদ্ধে। ঘটনাটি নিয়ে একাধিক মামলা, তদন্ত এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগকারী মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন জানান, তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালীন ১৯৯৬ সালে বারারচর মৌজার খতিয়ান নং ৩৪৬, বিএস খতিয়ান নং ৬৯৭, আরএস খতিয়ান নং ৬৫৬ এবং বিএস দাগ নং ২৬০-এর মোট ০.৬৭ শতাংশ জমির মধ্যে ০.৪০ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। পরে ২০০৩ সালে তাঁর স্ত্রী মনোয়ারা বেগম একই দাগে আরও ০.০৮ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। পরবর্তীতে জমি দুটির নামজারি সম্পন্ন করে নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করে আসছেন বলে দাবি করেন।
তিনি জানান, ২০০৫ সালে জমিতে নির্মিত তিনটি ঘর মোহাম্মদ সুলতান মাহমুদের কাছে ভাড়ায় দেওয়া হয়। ২০২০ সালের পর থেকে ভাড়ার টাকা চাইলে সুলতান মাহমুদ বারবার সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা ভাড়া বকেয়া রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। একপর্যায়ে সুলতান মাহমুদ ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে জমিটি নিজের ক্রয়কৃত বলে দাবি করেন।
এ ঘটনায় আমজাদ হোসেন শ্রীবরদী সিআর আমলি আদালতে সিআর নং-৪৫৭/২০২৪ মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত করে সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক মো. হজরত আলী দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪২০ ও ৫০৬ ধারার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে ১৭ জুন ২০২৫ তারিখে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ৪(১)/৭(৩) ধারায় সিআর মামলা নং-৪৮৯/২০২৪ দায়ের করা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা ভেলুয়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. আজহারুল ইসলাম তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, আমজাদ হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর নামে নিবন্ধিত দলিল, নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন করের কাগজপত্র পাওয়া গেছে। তবে অভিযুক্ত সুলতান মাহমুদকে জমির মালিকানার বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শনের জন্য বলা হলেও তিনি কোনো দলিল বা প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে শেরপুর জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সিনিয়র সহকারী জজ রাশেদুল আমিনের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবেদনকারী তাঁর দাবির সমর্থনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করলেও প্রতিপক্ষ কোনো বৈধ মালিকানার দলিল উপস্থাপন করতে পারেননি। ফলে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি সম্ভব হয়নি।
এছাড়া ১১ নং পুটিমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রদত্ত প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, আমজাদ হোসেন তাঁর ক্রয়কৃত জমিতে তিনটি ঘর নির্মাণ করে সুলতান মাহমুদকে ভাড়া দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, সুলতান মাহমুদও শেরপুর আদালতে সিআর মামলা নং-১১৪২/২০২৫ দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে মামলাটি তদন্ত করে শেরপুর সদর থানার তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরে বাদীপক্ষ নারাজি আবেদন করলে মামলাটি পুনরায় তদন্তের জন্য পিবিআই, জামালপুরে পাঠানো হয়।
এদিকে চলমান তদন্ত নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, পিবিআইয়ের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণ করে প্রভাবিত তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাদের অভিযোগ, তদন্ত চলাকালে একজন এএসআই এবং তাঁর সহযোগী অর্থ গ্রহণ করেছেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত প্রমাণ বা সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসীর দাবি, বিষয়টি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হলে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং দীর্ঘদিনের এই বিরোধের অবসান ঘটবে।
(বিঃদ্রঃ: এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব অভিযোগ মামলার নথি ও অভিযোগকারী পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলো প্রমাণিত বলে গণ্য করা যাবে না।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *