বাগেরহাটে রাস্তা নেই ৮৭ বছরের সন্তোষপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ভূমি অফিসের

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, বাগেরহাট:

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনঘেঁষা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার সন্তোষপুর ইউনিয়নে সন্তোষপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সন্তোষপুর ও চরবানিয়ারী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নিজস্ব জমি থাকলেও প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান দুটির জন্য তৈরি হয়নি কোনো যাতায়াতের রাস্তা। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও কাদায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সন্তোষপুর ইউনিয়নে ১৯৩৯ সালে ৪২ শতক জমির ওপর সন্তোষপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এরও আগে ৪১ শতক জমির ওপর সন্তোষপুর ও চরবানিয়ারী ইউনিয়ন ভূমি অফিস প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে মূল সড়কের সংযোগ স্থাপনে কোনো স্থায়ী রাস্তা নির্মাণ করা হয়নি।

কাদা-পানি মাড়িয়ে স্কুলে ১৩১ শিক্ষক-শিক্ষার্থী

বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ১৩১ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী রয়েছেন। বর্ষা এলেই তাদের প্রতিদিন কাদা ও পানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। এতে কোমলমতি শিশুদের স্কুলে যাতায়াত যেমন কষ্টকর হয়ে ওঠে, তেমনি তাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়।

বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থী সপ্তর্ষি রানা, সিয়াম হোসেন, কারিমন আক্তার, জান্নাতুল রাফিয়া, আয়শা আক্তার, পার্থ মজুমদার ও বিষাণ মজুমদার জানায়, তাদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য নিজস্ব কোনো রাস্তা নেই। জল-কাদা মাড়িয়ে অনেক কষ্ট করে প্রতিদিন স্কুলে যেতে হয় তাদের।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বর্ষার সময় রাস্তার পরিবর্তে কাদা ও পানি পেরিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে হয়। ফলে অনেক সময় পোশাক ও বই-খাতা নোংরা বা ভিজে যায়।

ভূমি অফিসেও দুর্ভোগের শেষ নেই

শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী নয়, একই সমস্যায় পড়ছেন সন্তোষপুর ও চরবানিয়ারী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ।

সেবা গ্রহীতা তাহিদুর রহমান বাবু, সাফায়েত হোসেন ও সুবল কর্মকার জানান, ভূমি অফিসে যাতায়াতের জন্য কোনো নিজস্ব রাস্তা না থাকায় কাদা ও পানি মাড়িয়ে অত্যন্ত কষ্ট করে অফিসে যেতে হয়। অনেক সময় পানিতে পড়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভিজে নষ্ট হয়ে যায়।

তাদের দাবি, সরকারি সেবা নিতে এসে যদি এভাবে কাদা-পানি মাড়িয়ে অফিসে যেতে হয়, তাহলে দ্রুত প্রতিষ্ঠান দুটির যাতায়াতের জন্য একটি স্থায়ী রাস্তা নির্মাণ করা প্রয়োজন।

সেবা গ্রহীতাদের কারণে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান

সন্তোষপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছায়া রাণী ব্রহ্ম জানান, বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য আজ পর্যন্ত কোনো রাস্তা তৈরি হয়নি। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, পাশের ভূমি অফিসে যাতায়াতের কোনো রাস্তা না থাকায় সেখানে আসা সেবা গ্রহীতাদের অনেকেই বিদ্যালয়ের বারান্দা ব্যবহার করেন। এতে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হয় এবং পাঠদান কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীর অফিস, প্রতিদিন অসংখ্য সেবাগ্রহীতা

সন্তোষপুর ও চরবানিয়ারী ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মনোজ বিশ্বাস বলেন, “আমরা এই অফিসে মোট পাঁচজন স্টাফ রয়েছি। এছাড়া প্রতিদিন অসংখ্য সেবা গ্রহীতা আসেন। কাদা ও পানির কারণে তাঁদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।”

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার সমস্যাটি থাকলেও বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ আরও তীব্র আকার ধারণ করে।

দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস ইউএনওর

এ বিষয়ে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট)বিকালে চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা আক্তার বলেন, “রাস্তার ঘটনাটি আমরা কিছুদিন হলো জেনেছি। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।”

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত বিদ্যালয় ও ভূমি অফিসের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য একটি টেকসই রাস্তা নির্মাণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সরকারি ভূমি অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে যাতায়াতের রাস্তা না থাকা শুধু দুর্ভোগের বিষয় নয়—এটি শিক্ষা ও সরকারি সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বড় প্রতিবন্ধকতা। বর্ষা এলেই যে দুর্ভোগ চরমে ওঠে, তার স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *