বিমানবন্দরে ট্রলি সংকট থেকে গ্রেপ্তার, রিমান্ডে আখতারুজ্জামান—নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক:
বিমানবন্দরে ট্রলি সংকট থেকে গ্রেপ্তার, রিমান্ডে আখতারুজ্জামান—নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন? ডিবি থেকে থানায় হস্তান্তরের পর এক দিনের রিমান্ড, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়েও জবাবদিহি চায় জনমত
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার ঘটনায় গ্রেপ্তার জামায়াতে ইসলামী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জনকে এক দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। এর আগে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করে। শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
পুলিশের করা মামলায় আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করলেও আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
ঘটনার সূত্রপাত যাত্রীদের ট্রলি সংকটে : মামলার এজাহার ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ অক্টোবর মদিনা থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটের যাত্রীরা বিমানবন্দরে নামার পর ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় ট্রলির সংকট দেখা দেয়। লাগেজ পেতে দেরি হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ ঘটনাস্থলে গেলে আখতারুজ্জামানের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে তাকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।
এ ছাড়া আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় ভিডিও ধারণ করলে নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন বাধা দেন। এ সময় তাকে গালিগালাজ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের পাশাপাশি যাত্রীদের জমজমের পানির বোতল ফেলে দেওয়া এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণের অভিযোগও মামলায় রয়েছে।
ডিবির হাতে গ্রেপ্তার, পরে থানায় : ২ অক্টোবর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। পরে শুক্রবার রাত সোয়া ৭টার দিকে তাকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করা হয় বলে থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার জানিয়েছেন। মামলার তদন্ত ও পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া বিমানবন্দর থানা পুলিশ পরিচালনা করছে।
৩ অক্টোবর তাকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আখতারুজ্জামানের বক্তব্যও তদন্তের অংশ হওয়া জরুরি: আদালতে আখতারুজ্জামান নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং মামলাটিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দাবি করেছেন বলে কয়েকটি প্রতিবেদনে এসেছে। ফলে মামলার অভিযোগের পাশাপাশি তার বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত—সবকিছু যাচাই করেই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
জামায়াতের প্রতিবাদ: আখতারুজ্জামানকে নিয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আখতারুজ্জামান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সংসদ সদস্য ও সম্মানিত নাগরিক। তার সম্পর্কে সাংবাদিকদের সামনে ‘অসম্মানজনক ও অবমাননাকর’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বক্তব্য থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
প্রশ্ন শুধু একজন ব্যক্তিকে ঘিরে নয় : এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
যদি সত্যিই পর্যাপ্ত ট্রলি না থাকার কারণে বিদেশফেরত যাত্রীদের লাগেজ সংগ্রহে দীর্ঘ অপেক্ষা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এটিও ব্যাখ্যা করতে হবে—কেন একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় ট্রলি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি এবং সংকট দেখা দেওয়ার পর তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর ছিল।
বিশেষ করে শাহজালালের মতো দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বারে ট্রলি সংকট, লাগেজ ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ ও ভিডিও ধারণের নিয়ম, নিরাপত্তাকর্মীদের দায়িত্ব এবং যাত্রীদের অভিযোগ মোকাবিলার প্রটোকল—এসব বিষয়ে প্রশাসনের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বা সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে কেউ বাধা দিয়ে থাকলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইন অনুযায়ী বিচার হওয়া জরুরি। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, সাবেক সংসদ সদস্যের মর্যাদা কিংবা অন্য কোনো সামাজিক পরিচয় তদন্তের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কারণ হওয়া উচিত নয়।
সরকারের জন্য এখন বড় পরীক্ষা স্বচ্ছতা: ঘটনাটির তদন্তে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে মূল প্রশ্নগুলো হলো—
প্রথমত, সিসিটিভি ফুটেজে প্রকৃত ঘটনা কীভাবে ধরা পড়েছে?
দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগের পক্ষে কী কী প্রমাণ রয়েছে?
তৃতীয়ত, বিমানবন্দরের ট্রলি সংকট কেন তৈরি হয়েছিল এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল কি না?
চতুর্থত, সংরক্ষিত এলাকায় ভিডিও ধারণের ঘটনায় নিরাপত্তা প্রটোকল যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না?
পঞ্চমত, মামলার তদন্তে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে কি না?
জনগণের প্রত্যাশা এখন একটাই—প্রকৃত ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং একই সঙ্গে বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনার কোনো ব্যর্থতা থাকলে সেটিও প্রকাশ্যে চিহ্নিত করে সংশোধন করা হোক। কারণ, বিমানবন্দরে একজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে কর্মকর্তার বিরোধ কেবল ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা, যাত্রীসেবা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নও জড়িত। সর্বশেষ পরিস্থিতি: ৩ অক্টোবর আদালত আখতারুজ্জামানের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও অন্যান্য প্রমাণ কতটা গুরুত্ব পায় এবং বিমানবন্দরের ট্রলি সংকটের প্রশাসনিক দায় নির্ধারণে কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়—এখন সেদিকেই নজর থাকবে।

