বাংলাদেশকে জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতায় প্রস্তুত ইরান

সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক:
পশ্চিমা আধিপত্য ও যুদ্ধের এই চরম সংকটকালে বাংলাদেশ ও ইরানের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব নতুন বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। গত রোববার (৫ এপ্রিল) আমার দেশের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি স্পষ্ট করে বলেছেন, তারা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তন ও বিএনপির আগামীর নেতৃত্বকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছেন। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা, গভীর সমুদ্রে খনিজ অনুসন্ধান ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় ইরান বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে শতভাগ প্রস্তুত। তেহরান প্রত্যাশা করে, তারেক রহমানের সুদক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ এক স্বাধীন ও সার্বভৌম কূটনীতির নজির স্থাপন করবে এবং কোনো পরাশক্তির চাপে না পড়ে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও শান্তি রক্ষায় সাহসী ভূমিকা পালন করবে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন আমার দেশের বিশেষ প্রতিনিধি আবু সুফিয়ান

বাংলাদেশের কাছে এই মুহূর্তে প্রত্যাশার বিষয়ে রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় থাকলে আমাদের কোনো প্রত্যাশা থাকত না। এখন বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায়। তারা আমাদের বন্ধু। ম্যাডাম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমাদের নিবিড় সম্পর্ক ছিল এবং তার সময়েই প্রেসিডেন্ট রাফসানজানি বাংলাদেশ সফর করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান এবং এরপর নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ে আমরা খুব খুশি হয়েছি। আমরা বাংলাদেশের সরকারকে স্বাধীন নীতির এবং আমাদের বন্ধু ও ভাই হিসেবে মনে করি। আর সেই হিসেবে বাংলাদেশের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল, তারা আমেরিকার আগ্রাসনের নিন্দা করবে। আমরা সাধারণত আমাদের বন্ধুর কাছেই অভিযোগ করি, এক ভাই আরেক ভাইয়ের কাছে যা প্রত্যাশা করে। আপনি যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে অন্যের চেয়ে নিজের ভাইয়ের কাছেই সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা করবেন। আমার আগের সাক্ষাৎকারের কষ্টের জায়গাটা এই কারণেই ছিল।’

ইরানি রাষ্ট্রদূত বলেন, “আমরা আসলে চেয়েছিলাম যারা আগ্রাসনকারী, তাদের নামটা আসুক। কারণ আমরা এখানে আগ্রাসনের শিকার হয়েছি। আমরা ইরানি একটা প্রবাদে বলি ‘কষ্টের দিন প্রকৃত বন্ধুকে চেনা যায়’। আমরাও বাংলাদেশের কঠিন সময়ে অবশ্যই তাদের পাশে থাকব।”

মার্কিন আগ্রাসন ও বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব: রাষ্ট্রদূত সতর্ক করে বলেন, ‘ইরানের ওপর আমেরিকা-ইসরাইলের যৌথ হামলা শুধু একটি মুসলিম দেশের ওপরে নয়, এটি প্রকৃতপক্ষে সারা বিশ্বের অর্থনীতি, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক বিষয় এমনকি জাতিসংঘ সনদের ওপরও হামলা। জাতিসংঘ সনদের বাইরে গিয়ে এবং একটা চলমান আলোচনার মাঝখানে এই হামলা করা হয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশ পর্যন্ত চলে এসেছে। বাংলাদেশে তেলের পাম্পে যে লম্বা লাইন, তার মূল কারণ আমেরিকার এই আগ্রাসন।’

খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া যিনি বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন নেত্রী এবং তিনি আমাদেরও অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। তার মৃত্যুতে আমাদের দূতাবাসে পতাকা তিনদিন অর্ধনমিত রেখেছিলাম। খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমান বাংলাদেশে স্বাধীন চিন্তা ও স্বাধীন নীতির একটি প্রতীক। তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা সাক্ষাতের জন্য আবেদন করেছি যাতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো নিবিড় করতে পারি। যেহেতু তারেক রহমান কাজ শুরু করেছেন, আমরা ওনাকে সাপোর্ট করতে চাই যাতে আমাদের সম্পর্ক ভালো থাকে।’

জ্বালানি নিরাপত্তা ও নৌ-সহযোগিতা: সংকট শুরুর প্রথম থেকেই ইরান বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে জানিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। আমরা জানিয়েছি, হরমুজ দিয়ে যদি বাংলাদেশের কোনো জাহাজ পার হতে চায়, আমাদের তালিকা দিলে সহযোগিতা করব। তারা ছয়টা জাহাজের তালিকা দিয়েছেন, যার মধ্যে একটি জাহাজ সৌদি আরবের বন্দরে লোড হয়েছে এবং সে ব্যাপারে ইরান সরকার সহযোগিতার সম্পূর্ণ আশ্বাস দিয়েছে।’

জ্বালানি অনুসন্ধানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইরান গ্যাসের দিক থেকে বিশ্বে তৃতীয় এবং তেলের দিক থেকে পঞ্চম। বাংলাদেশ চাইলে তেল-গ্যাস কূপ অনুসন্ধান, উত্তোলন বা রিফাইনারি প্রতিষ্ঠায় আমরা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), স্টেম সেল গবেষণা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইরানের যে সক্ষমতা আছে, তা দুই দেশের মধ্যে ভাগ করে নিতে আমরা আগ্রহী।’

জাতিসংঘের দ্বিমুখী নীতি ও ইসরাইলি তোষণ: সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার দ্বিমুখী নীতি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের প্রায় ২৫ শতাংশ বাজেট আমেরিকা দেয় এবং সদর দপ্তর আমেরিকাতে হওয়ায় সেখানে যাতায়াতের অনুমতিও তাদের হাতে। ফলে এই সংস্থার ওপর আমেরিকার একটা বড় নিয়ন্ত্রণ আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভেটো প্রথা চালুর কারণে জাতিসংঘ তার লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। জর্জ অরওয়েল মজা করে বলেছিলেন, সব দেশের সমান অধিকার, তবে বিশেষ কিছু দেশের বিশেষ অধিকার। যখনই আমেরিকা সমস্যায় পড়ে, নিরাপত্তা পরিষদ তাদের পক্ষে কাজ করে। কিন্তু দরিদ্র বা মুসলিম দেশ সমস্যার মুখে পড়লে তারা এড়িয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘৭০ বছর ধরে ফিলিস্তিনিরা উদ্বাস্তু, আজ পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদ ইসরাইলের বিরুদ্ধে একটিও প্রস্তাব পাস করেনি। ইসরাইলের অন্তত দুই শতাধিক পারমাণবিক বোমা থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অথচ ইরান, ইরাক বা লিবিয়ার ব্যাপারে খুব সহজেই প্রস্তাব পাস করা হয়।’

মুসলিম বিশ্বের অনৈক্য ও প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূমিকা: মুসলিম দেশগুলোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘মুসলিম দেশগুলোর অনেকেই আমেরিকার সঙ্গে গভীর চুক্তিতে আবদ্ধ। বিশেষ করে আরব দেশগুলো মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিয়ে রেখেছে। ট্রাম্প যখন মধ্যপ্রাচ্য সফর করে, তখন এই আরব দেশের সরকারগুলো তাদের দেশের মেয়েদের নাচের মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানায়, মূল্যবান উপঢৌকন দেয়। এগুলো আমেরিকার অপরাধের অংশীদারত্ব। তবে তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশের নীতি স্বাধীন। তারা আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্যের অধীনে নয়। আমরা তাদের সীমাবদ্ধতা বুঝি। অথচ আমেরিকান যুদ্ধবিমানগুলো কুয়েত, সৌদি আরব বা বাহরাইনের ঘাঁটি থেকে উড়ছে এবং সেখানেই অবতরণ করছে। তারা কেন তাদের ভূখণ্ড আরেকটি মুসলিম দেশে হামলার জন্য ব্যবহার করতে দিচ্ছে?’

ট্রাম্পের আলটিমেটাম ও ইরানের চরম হুঁশিয়ারি: যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের জন্য ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে। তারা হুমকি দিয়েছে, ইরানের জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে টার্গেট করবে। আমরা এখন পর্যন্ত কোনো মুসলিম দেশের জ্বালানি বা অবকাঠামোতে আক্রমণ করিনি। কিন্তু যদি ট্রাম্প হুমকি বাস্তবায়িত করে, তবে আমরাও ব্যাপকভাবে জবাব দেব। আমরা আরব দেশের সেই সমস্ত তেল স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করতে পারি যেখানে আমেরিকার বিনিয়োগ আছে। এমনকি বাব-আল-মান্দাব প্রণালিও আমরা বন্ধ করে দিতে পারি। এতে বিশ্বে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে। ট্রাম্প পুরা দুনিয়াটাকে ইসরাইলের স্বার্থে বিলিয়ে দিচ্ছে। আমাদের আগে বা এখনো হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার মতো শক্তি আছে, কিন্তু আমরা সেটা এখনো করিনি।’

শান্তি স্থাপনে বাংলাদেশের বড় ভূমিকা: বাংলাদেশের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ভালো। তাই বাংলাদেশ আমেরিকাকে বোঝাতে পারে, শোষণ ও পদানত করে রাখার দিন শেষ। পাকিস্তান যেমন আরব ও ইসলামি দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে, বাংলাদেশও তেমনি মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দিতে প্রতিবেশী দেশগুলোকে বোঝাতে পারে। বাংলাদেশ এখন মুসলিম বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পক্ষ। মিশর, তুরস্ক বা পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশও শান্তির জন্য বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। আমরা চাই না বাংলাদেশ যুদ্ধে আসুক, তবে ওমানের মতো শান্তির প্রচেষ্টা চালাক, এটা আমাদের কাম্য। আপনাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী নিজে সরাসরি আমাদের প্রেসিডেন্ট ও মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’

স্থল যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ ও শেষ বার্তা: যুদ্ধের ফলাফলের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘স্থল অভিযানে আমেরিকা বা ইসরাইল কোনো ফলাফল পায়নি। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ হতে পারে। আমেরিকা পালানোর রাস্তা খুঁজছে এবং হয়তো কোনো দ্বীপে বা তেহরানে অঘটন ঘটিয়ে বিজয়ী ঘোষণা করতে চায়। আমরা বহু বছর ধরে অপেক্ষা করছি, আমেরিকানরা আমাদের সীমানায় আসুক। তারা ল্যান্ডিং অ্যাটাকে ঢুকলে আর বের হতে পারবে না। ট্রাম্প আসলে রাজনীতি বোঝেন না, তিনি কনস্ট্রাকশন বিজনেসের মানুষ। স্থলযুদ্ধে আমাদের যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনেক বেশি। ইনশাআল্লাহ এমন কিছু ঘটলে তাদের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে এবং অন্য দেশে হামলা করার আগে হাজারবার ভাববে।

সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে এসে তিনি বাংলাদেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বাংলাদেশ-ইরান ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্ব অটুট রাখার আহ্বান জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *