আসন বণ্টন নিয়ে বিএনপির মিত্রদের মধ্যে অস্থিরতা
সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক: যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের আসন ছাড় নিয়ে বিএনপি এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে না আসায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে কিছুটা অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, প্রার্থী ঘোষণায় যত দেরি হবে, ছোট দলগুলোর প্রার্থীরা নির্বাচন প্রস্তুতিতে ততই বিপাকে পড়বেন। তবে বিএনপির নেতারা বলছেন, শরিকদের আসন চূড়ান্ত করতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান শিগগিরই লিয়াজোঁ কমিটির সঙ্গে ভার্চ্যুয়ালি বৈঠক করবেন।
সম্প্রতি দুই ধাপে ২৭২ আসনে সম্ভাব্য একক প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। এসব প্রার্থী ঘোষণার পর অনেক মিত্র রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা বিস্মিত ও হতাশ হয়েছেন। কারণ এদের মধ্যে কয়েকজন এতদিন নিজ আসনে ভোটের গণসংযোগে বেশ সক্রিয় ছিলেন। এখনো ২৮টি আসন ফাঁকা রেখেছে বিএনপি। দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এসব আসনের বেশিরভাগই যুগপৎ আন্দোলনের মিত্র দলগুলোর জন্য রাখা হয়েছে। তবে কয়েকটি বিরোধপূর্ণ আসনও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে মিত্রদের সঙ্গে আসন সমঝোতার বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে চাইছে বিএনপিও।
দলটির নেতাদের মতে, যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী ও শরিক দলগুলোর চাহিদামতো আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে তারা কিছুটা জটিলতায় পড়েছেন। কিন্তু তার চেয়েও বড় সমস্যা মনে করা হচ্ছে জোটগতভাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও নিজস্ব প্রতীকে ভোট করার বিধানটি নিয়ে। আরপিওর সংশোধনীর কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে; যা জোটবদ্ধ ছোট দলগুলোর জয়ের সম্ভাবনাকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসার মতো জোটের প্রভাবশালী প্রার্থীদের বিএনপি ছাড় দিতে চায়। এদিকে ফাঁকা ২৮টি আসনের মধ্যে কয়েকজনকে ইতোমধ্যে ‘সবুজ সংকেত’ও দেওয়া হয়েছে।
দলটির একাধিক নীতিনির্ধারক জানান, জোটে ভোট করলেও নিজ দলের প্রতীকেই নির্বাচন করতে হবে, এমন বিধানের ফলে ভোটের হিসাব-নিকাশ করে ভেবেচিন্তে অগ্রসর হতে হচ্ছে বিএনপিকে। কারণ, এমন বিধানে ভোট করে অন্য কোনো দল লাভবান হবে কিনা তাও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। এর হিসাবটা হচ্ছে, ছোট দলগুলো বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে আছে একসঙ্গে নির্বাচন করার জন্য এবং সংসদ-সদস্য পদে জোটের প্রার্থী হওয়ার আশায়। সে ক্ষেত্রে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীককে ছোট দলগুলোর নেতারা জয়ের ক্ষেত্রে বড় ভরসা হিসাবে দেখেন। আরপিওর প্রতীকসংশ্লিষ্ট ধারাটি সংশোধনের ফলে এতে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিএনপির সমর্থন পেলেও ব্যক্তিজনপ্রিয়তা না থাকলে ছোট দলগুলোর নেতাদের নিজ দলীয় প্রতীকে জয়ী হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে রাজনীতিতে আলোচনা আছে।
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা শরিক বা মিত্র দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের প্রার্থিতার বিষয়টি নানাভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করছেন। বিগত আন্দোলনে শরিক দলগুলোর নেতাদের ভূমিকা, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান, ভবিষ্যৎ সরকার গঠনে তাদের প্রয়োজনীয়তাসহ বিভিন্ন বিষয় প্রার্থিতার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিচ্ছেন। সে হিসাবে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল ও জোটের জন্য সর্বোচ্চ ২২ আসন ছাড়ের কথা ভাবা হচ্ছে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বৃহস্পতিবার বলেন, আমাদের সমমনা মিত্র যারা আছেন তাদের আসনসহ আরও দু-একটা দলীয় প্রার্থীর আসনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। সেগুলো আরও পরে এবং যথাসময়ে ঘোষণা করা হবে বলে জানান তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান যুগান্তরকে বলেন, প্রার্থী বাছাইয়ে দলের সামগ্রিক লাভ-ক্ষতি হিসাব-নিকাশ করা হয়। সেই হিসাব-নিকাশ শেষে উপযুক্ত প্রার্থীকেই দল বেছে নেয়। ভোট তো এক রকম উৎসবের মতো। ভোটের আগে নানা গুঞ্জন উঠবে, সেটা নিয়ে নানা পক্ষের নানা মত-দ্বিমত থাকবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মিত্রদের ছাড় দেওয়ার জন্যই তো এখনো আসন ফাঁকা রাখা হয়েছে। নানা কারণে মিত্রদের কেউ বাদ পড়লে তাদের ভিন্ন ভাবে যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে।
এদিকে পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে শুক্রবার ১২ দলীয় জোটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জোট প্রধান জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দারের খিলগাঁও কার্যালয়ে বৈঠকে শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করে প্রার্থী ঘোষণায় তারা বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। বিএনপির ২৭২ আসনে মনোনয়ন ঘোষণার মাধ্যমে প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও করণীয় সম্পর্কে সোমবার এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জোটের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রদানের কথাও প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। তবে এই বৈঠকে জোটের মুখপাত্র বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম উপস্থিত ছিলেন না।

