বিডিআর হত্যাকাণ্ডে ভারতের গভীর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে ষড়যন্ত্র, প্রশ্ন ও তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন জমা

সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক: মেজর নাসিরের বক্তব্য- ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পরবর্তী ১২-১৫ বছরের মধ্যে নৈতিকভাবে দাঁড়াতে না দেয়াই ছিল তাদের পরিকল্পনা।’
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। ওই সময়কার পরিস্থিতিতে ভারতীয়দের সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গ তুলে কমিশনপ্রধান বলেন, ‘ওই সময় ৯২১ জনের মতো ভারতীয় দেশে এসেছিল। তার মধ্যে ৬৭ জন ভারতীয়র হিসাব মিলছে না। ফজলুর রহমান জানান, এই ঘটনার পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে হয়েছে। তার ভাষায়, ‘এটা একদিনে হয়নি। যেমন তাপস এসে বিভিন্ন সময় মিটিং করেছেন। সর্বশেষ দিনে এই কিলিংটা হয়েছে।’ ষড়যন্ত্র কখন শুরু হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২০০৮ থেকে শুরু হয়েছে এটা বলতে পারেন। নির্বাচনের আগে থেকে শুরু হয়েছে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পেছনে ‘দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা’ এবং এর সঙ্গে ‘ভারতীয় যোগসাজশ’ থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান। রোববার (৩০ নভেম্বর) ১৬ বছর আগের ওই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন।

পিলখানা ম্যাসাকার নিয়ে গঠিত স্বাধীন তদন্ত কমিশন বিভিন্ন প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ তথ্য, সাক্ষ্য, বিদেশী প্রকাশনা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণ করে অনুসিদ্ধান্তে এসেছে- ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ এর বিডিআর হত্যাকাণ্ডে ভারতের সম্ভাব্য গভীর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যৌক্তিক ও তদন্ত-উপযোগী। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- এই বিডিআর বিদ্রোহ- বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ও রহস্যঘেরা হত্যাযজ্ঞ। এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন, প্রত্যক্ষদর্শী, সামরিক কর্মকর্তা, নিহত অফিসারদের পরিবারের সদস্য এবং বিদেশী রিসার্চভিত্তিক প্রকাশনাসহ বহু উৎসে ভারতের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার অসংখ্য ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ঘটনা-পরম্পরার গভীরে গেলে উঠে আসে বিদেশী যোগাযোগ, সন্দেহজনক আগমন-বহির্গমন, ভারতীয় সংস্থার উপস্থিতি, কূটনৈতিক তৎপরতা ও সীমান্তে সেনাসমাবেশের মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য।

বিদেশে ‘র’-এর সাথে বৈঠক ও সেনাবাহিনী দুর্বল করার অভিযোগ : ২০০৮ সালের জুনে মেজর নাসির উদ্দিন (বিএ-১১৮৩৮) বরিশালে ডিজিএফআই কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুস সালামকে জানান, তিনি বিদেশ সফর শেষে একই বিমানে আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে দেখতে পান। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই নেতারা ভারতের বারাসাতে ‘র’-এর সাথে বৈঠক শেষে ফিরছিলেন। বৈঠকে অংশ নেয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আবুল হাসনাত আবদুল্লাহসহ অন্যরাও ছিলেন বলে তিনি দাবি করেন। মেজর নাসিরের বক্তব্য- ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পরবর্তী ১২-১৫ বছরের মধ্যে নৈতিকভাবে দাঁড়াতে না দেয়াই ছিল তাদের পরিকল্পনা।’

গণমাধ্যমকে কমিশনের প্রধান আ ল ম ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, ‘৯২১ জন ভারতীয় ওই সময়টাতে এসছিলো বাংলাদেশে। তার মধ্যে একটি হিসাবে ৬৫ জন, আরেকটি হিসাবে ৬৭ জন দেখা যাচ্ছে যে তারা বিমানে এসেছে, কিন্তু বিমানে ফিরে যায়নি, আবার বাইল্যান্ডে এসেছে, আবার ওইদিক দিয়ে ফিরে যায়নি। এই স্ট্যাটিসটিকসগুলো আমরা পেয়েছি।’
তবে এই ব্যক্তিরা পিলখানার ঘটনায় জড়িত কি না বা কীভাবে জড়িত, এমন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন বলে জানান তিনি।

‘এইটা বলা খুব মুশকিল। কারণটা হলো যে, এটা সন্দেহের উদ্রেক করে। বিকজ এই লোকগুলো এসে আর ফিরে যায়নি। যেই চ্যানেলে এসছিলো সেই চ্যানেলে তারা আর ফিরে যায়নি। আমাদের কাছে তাদের ফুল ডকুমেন্ট আছে, নামসহ পাসপোর্ট নম্বর একেবারে এভরিথিং,’ বলেন জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রধান আ ল ম ফজলুর রহমান। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬শে ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআরের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। এই ঘটনায় হত্যা মামলার আসামি ছিল ৮৫০ জন; অপরদিকে বিস্ফোরক আইনের মামলাটিতে ৮৩৪ জনকে আসামি করা হয়। বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় ১৫২ জনকে। পরে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে হাইকোর্ট। বাংলাদেশে এটাই প্রথম মামলা যাতে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসামি এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে রায়ের পর আইনজীবীরা জানিয়েছিলেন। ক্ষমতার পালাবদলের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এসে ১৬ বছর পর এ বছরের জানুয়ারিতে প্রথমবারের মতো এই মামলার প্রায় আড়াইশো আসামিকে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় জামিন দেয় আদালত। (সূত্র বিবিসি)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *