উপকূলের পানির জন্য উত্তাল মোরেলগঞ্জ—লবণাক্ততার থাবায় বিপর্যস্ত জনজীবন, দ্রুত সমাধান দাবি

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি: জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় উপকূলীয় জনপদের দীর্ঘদিনের পিপাসা আজ যেন বিস্ফোরিত হলো বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে। মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর ২০২৫) সকালে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হলো এক বিক্ষোভধর্মী সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন ও পদযাত্রা—যেখানে প্রতিধ্বনিত হলো একটাই স্লোগান:
“লবণাক্ততার জীবন চাই না—সবার জন্য সুপেয় পানি চাই!”

জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের “সৃজন প্রকল্প”-এর আওতায় আয়োজিত এ কর্মসূচিতে অংশ নেন শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ—কৃষক, জেলে, গৃহবধূ, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শ্রমজীবী নারী-পুরুষ। সকাল দশটায় উপজেলা চত্বর ঘিরে শুরু হয় বিক্ষোভধর্মী পদযাত্রা, যা অল্প সময়ের মধ্যেই জনতার ঢলে রূপ নেয়। লবণাক্ততার ভয়াবহতা: পানির জন্য মানুষের হাঁটা–হাঁটি নয়, মরিয়া লড়াই উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর পানিসংকট এখন আর সাধারণ সমস্যা নয়—এটি মানুষের বেঁচে থাকার সংকটে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ— নলকূপ বসালেও কয়েক মাস পর লবণাক্ত পানি উঠে পুকুরের পানি নোনা হয়ে যায় চরম লবণাক্ততার কারণে রান্না, পান করা, এমনকি কাপড় ধোয়ারও উপযোগী পানি নেই প্রতিদিন ২–৩ কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হয় নারীদের রোগবালাই বাড়ছে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে

একজন অংশগ্রহণকারী নারী বললেন— “আমরা পানি আনার মানুষ না—মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার আমাদেরও আছে।” সরকারি কর্মকর্তার স্পষ্ট সতর্কতা: ‘এ সংকট আরও বাড়বে’ পদযাত্রার প্রধান অতিথি মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ হাবিবুল্লাহ বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন উপকূলীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় এনে দিয়েছে পানির ক্ষেত্রে। লবণাক্ততা আগামী বছরগুলোতে আরও বাড়তে পারে। তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।”

তিনি জানান— সরকার বিভিন্ন প্রকল্পে পানি সমস্যা সমাধানে কাজ করছে, তবে সেগুলো দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল। জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া স্থায়ী সমাধান আসবে না। ক্যাম্পেইনে ওঠে আসা মূল বার্তা—সমাধান এখনই চাই সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করা হয়— ✔ পুকুরভিত্তিক পানি পরিশোধন প্রযুক্তি ✔ রেইনওয়াটার হারভেস্টিং বাড়ানো
✔ টেকসই পানি ব্যবস্থাপনায় জনগণের দায়িত্ব ✔ পল্লীস্তরে নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ ✔ পানির অধিকার নিশ্চিত করতে জনমতের চাপ বৃদ্ধি
কর্মসূচি শেষে আয়োজকরা জানান— “জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে উপকূলে। তাই এখানকার মানুষের পানি অধিকার প্রতিষ্ঠা এখন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সামিল।” মানুষের কান্না-হাসি মিশে থাকা বাস্তবতা—যা বদলাতে হবে এখনই মোরেলগঞ্জের সড়ক ঘিরে পদযাত্রায় দেখা যায়— ছোট ছোট শিশুদের হাতে ব্যানার: “মা পানি আনতে যায়, স্কুলে দেরি হয়।”
কৃষকদের প্ল্যাকার্ড: “লবণাক্ততায় ফসল নেই, পানিও নেই।” গৃহবধূদের প্রতিবাদ: “এক কলস পানির জন্য ঘণ্টা পার!” স্থানীয়রা বলেন—পানি সংকট এখন আর শুধু পানির সমস্যা নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও অর্থনীতির সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: আশার আলো জ্বেলে BMZ ও NETZ বাংলাদেশ এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে জার্মান সরকারের উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা BMZ এবং NETZ বাংলাদেশ। তারা বলেন— “উপকূলীয় অঞ্চলের পানি সংকট বৈশ্বিক বিষয়। ভবিষ্যতে আরও বড় প্রকল্পে কাজ করা হবে।” উপসংহার: উপকূলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের প্রতিরোধে

মোরেলগঞ্জের মানুষের আজকের পদযাত্রা শুধু প্রতিবাদ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার জন্য এক ঐতিহাসিক ঘোষণা—
“পানির জন্য আমরা নীরব থাকব না।” উপকূলের এই আন্দোলন দেখিয়ে দিল— যেখানে পানি সংকট, সেখানেই মানুষের ঐক্য।
যেখানে লবণাক্ততার ভয়, সেখানেই পরিবর্তনের আগুন। আর সেই আগুনই হয়তো বদলে দেবে উপকূলের আগামী।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *