তালা মির্জাপুর হিন্দুদের প্রতিমা বিসর্জনের খাল বিএনপি নেতার দখলে
হাবিবুলালাহ বাহার হাবিব/ সাতক্ষীরা : তালা উপজেলা ৪ কুমিরা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও সদ্য সাবেক তালা উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি গোলাম মোস্তফার ইন্ধনে তার আপন ছোট ভাই জাকারিয়ার বিরুদ্ধে হিন্দুদের প্রতিমা বিসর্জনের স্থান সরকারী খাল দখলের অভিযোগ উঠেছে। জাকারিয়া তালা উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামের আতিয়ার রহমানের ছেলে। বড় ভাইয়ের (গোলাম মোস্তফা) প্রভাবে জাকারিয়াও এখন বিএনপির বড় নেতা। যার আরেক নাম ভূমি দস্যু ও দাঙ্গাবাজ জাকারিয়া। সাধারণ মানুষ এবং প্রতিবেশীদের মাঝে জমি সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব লাগানো যার কাজ। সুযোগ বুঝে উভয় পক্ষের কাছ থেকে দলীয় পরিচয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে অর্থ বানিজ্যের অভিযোগও রয়েছে জাকারিয়ার বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসী এই প্রতিবেদককে জানান, গত ৫ই আগষ্ট ২৪ এই জাকারিয়া নেতৃত্ব দিয়ে কুমিরা বাসস্টান্ড, কদমতলা, মির্জাপুর, মেলেকবাড়ি ও সেনপুর বাজারের দোকানপাটে হামলা-ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। এলাকাবাসী আরো জানায়, ৫ই আগস্টের পর জাকারিয়া পরিকল্পিত ভাবে তাঁর লাঠিয়াল সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে হিন্দুদের প্রতিমা বিসর্জনের স্থান সরকারী খাল দখল করে নেয়। জনসাধারণ বাধা দিলে তাদের জীবন নাশের হুমকি দেয়। একদিকে বড়ভাই বিএনপির বড় নেতা অন্যদিকে জাকারিয়ার হুঙ্কারে এলাকার লোক তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না। এলাকাবাসী ভুমি দস্যু জাকারিয়ার আতঙ্কে অতিষ্ঠ। যে কারণে জেলা প্রশাসকের নিকট অভিযোগ দিতেও ভয় পাচ্ছে এলাকাবাসী।
সূত্রে জানা যায়, তালা উপজেলার মির্জাপুর মৌজার জে এল নাম্বার ৯৮, খতিয়ান নম্বর সাবেক ৮৫, হাল নাম্বার৭৮, দাগ নাম্বার ৬১৪ এর ৮৮ শতক অকৃষি জমির প্রকৃত মালিক রায় গিরিশ প্রসন্ন মুখোপাধ্যায়ের দুই ছেলে জগৎ প্রসন্ন মুখপাধ্যায় ও শৈলজা প্রসন্ন মুখপাধ্যায়। দীর্ঘ দিন ধরে এই অকৃষি জমি উন্মুক্ত থাকায় এলাকার সর্ব জনসাধারণ ভোগদখল বা ব্যবহার করে আসছে। এই অকৃষি খন্ড জমিটি মির্জাপুর শ্মশান ঘাটের খাল নামে পরিচিত হলেও প্রকৃতপক্ষে সেটা ছিলো ডোবা। প্রকৃত মালিক ছিলো হিন্দু সম্প্রদায়। শত বছর ধরে এই ডোবায় মির্জাপুর এলাকার ১০ গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায় প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে আসছে। পরবর্তীতে এই মালিকানাধীন অকৃষি জমির মালিকানা বাংলাদেশ সরকারের অধীনে চলে যায়। যার দাগ নাম্বার ৩২৭ ও খতিয়ান নাম্বার- ১। বর্তমান মাঠ পর্যায় হিন্দুদের প্রতিমা বিসর্জনের স্থান ও সর্ব জনসাধারণের ব্যবহার্য উলেখ রয়েছে।
মির্জাপুর বাজার সংলগ্ন সরকারি ১ নং খতিয়ানভুক্ত খালে প্রাচীনকাল থেকে আশ পাশ এলাকার পানি নিষ্কাশন হয়ে আসছে। খাল একদিকে সরকারি সম্পত্তি ও অন্যদিক বাজারসহ আশ পাশ এলাকার পানি নিস্কাশনের একটি প্রধান জলাধার। এ খাল ভরাট হলে এলাকার বৃহত্তর একটি অংশ মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখিন হবে বলে আশঙ্কা করছে জনসাধারণ।
গত বছর ৫ই আগষ্টের পরপরই এই খাল জবরদখলে নিয়ে মাছ চাষ শুরু করে ভুমি খেকো জাকারিয়া। এলাকায় প্রচার করে বেড়াচ্ছে সে ১৯৮৮ সালে বেনামে ৯৯ বছরের জন্য সরকারের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নিয়েছে।
পাটকেলঘাটা ভুমি অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই খাল জাকারিয়া নামে কোনো বন্দোবস্ত নেই। প্রকৃতপক্ষে, কুমিরা গ্রামের কেরামতের ছেলে আব্দুল্ খালেকের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। ৬১৪ দাগের ৪০ শতাংশ জমি বিলান দেখিয়ে অফিসের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ খালেকের নামে বন্দোবস্ত করে নেয়। যাহার সেটেলমেন্ট কেস নাম্বার ১৯০৪ / ৮৮ — ৮৯ । তবে সরকারি বিধি মোতাবেক ১ খতিয়ানের জমি বন্দোবস্ত দিতে অবশ্যই ঐ ব্যক্তি ভুমি হীন হতে হবে। অর্পিত জমি কৃষি কাজে ব্যবহারের উপযোগী হতে হবে।
বন্দোবস্তের প্রধান উদ্দেশ্য হলো: ভূমিহীন কৃষক ও দরিদ্র পরিবারের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রীয় অধিগৃহীত জমি বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৭ (সংশোধিত ২০১৪ ও ২০১৮) বন্দোবস্তকৃত জমি কৃষিকাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
খাসজমি বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৭ (গ্রামীণ কৃষি খাস জমি) অবৈধ দখলকারীরা জমি বন্দোবস্তের যোগ্য হবেন না। তবে কোন আইনে এই খাল বন্দোবস্ত দিয়েছে প্রশ্ন এলাকাবাসীর । বন্দোবস্ত ঐ ব্যক্তি পাবে প্রকৃত দখলদার, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি জমি ব্যবহার করছেন। প্রকৃত দখলদার হিন্দু সম্প্রদায় যাহার প্রকৃত মালিক ছিলো তারা। ভুমি দস্যু জাকারিয়া বন্দোবস্তর নিজের নামে দোহাই দিয়ে উক্ত খাল পুরাটাই দখল করে নেয়।
সরেজমিনে যেয়ে দেখা যায়, উক্ত জমি কৃষি উৎপাদনে উপযোগী নয়। ৬১৪ দাগের জমি মূলত খাল ছিল। বর্তমান খাল থেকে ডোবায় পরিণত হয়েছে। শত বছর ধরে শশ্মান ঘাটের খাল নামে পরিচিত। সরকারি বিধি মোতাবেক অর্পিত কৃষি জমি ছাড়া, খাল বা নদী বন্দোবস্ত দেওয়া আইন বহির্ভূত।
সরকারি খাল/ডোবা দখলের বিরুদ্ধে হিন্দু সম্প্রদায় ও এলাকার জনসাধারণ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী খাল শ্রেনীভুক্ত ভুমি লিজ বা বন্দোবস্ত দেয়া সরকারি আইন বহির্ভূত। অন্যদিকে দখলকারী শ্বশান কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার তাপষ ঘোষ এ প্রতিবেদক বলেন, ১৯৮৮ সালে সরকারের নিকট থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে থাকলে পরবর্তীতে আরএস মাঠ জরিপে সে কেন নিজ নামে মাঠ পর্চা ও রেকর্ড নিতে পারলো না? তিনি আরো বলেন, গত বছর কালি পুজার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি তালা কলারোয়ার সাবেক সংসদ সদস্য, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুল ইসলাম হাবিব ভাই এই সরকারী খালটি শ্বশানের নামে বন্দোবস্ত প্রতিশ্র“তি দিয়ে যান। আজ তার দলের লোকই খালটি দখলে নিয়ে মাঝ চাষ করলেও তিনি কোন পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে।
খাল দখলের বিষয় অভিযুক্ত জাকারিয়ার বড় ভাই তালা উপজেলা বিএনপির সদ্য সাবেক সহ সভাপতি গোলাম মোস্তফার কাছে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে সরাসরি তালা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাহাত খান এর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি দুঃখজনক, কোনোভাবেই অনিয়ম দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না। তিনি আরো বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো লোক আবেদন করলে তদন্ত পূর্বক ভুমি দস্যুদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গত ১৩ অক্টোবর এই প্রতিবেদক উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করলে ঐদিন বিকেলেই তালা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপা রাণী সরকার ও তালা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাহাত খান ঘটনা স্থলে পরিদর্শন করেন এবং এলাকাবাসীকে বলেন, আগামী সপ্তাহে জমির কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে বিহিত ব্যবস্থা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

