পিরোজপুরে অবৈধ কোচিংয়ের খবর সংগ্রহে গিয়ে ৩ সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ
মোঃ মনিরুল ইসলাম চৌধুরী,স্টাফ রিপোর্টার, পিরোজপুর:
পিরোজপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (গণিত) আরাফাতুর রহমানের বিরুদ্ধে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে কোচিং করানোর অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে তিন সাংবাদিকের ওপর অতর্কিত হামলার অভিযোগ উঠেছে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ঘটনায় তিন সাংবাদিক আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে পিরোজপুর শহরের কৃষ্ণচূড়া মোড় এলাকায় শহীদ ওমর ফারুক কিন্ডারগার্টেনের পেছনে একটি কক্ষে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সাংবাদিকদের অভিযোগ, ওই কক্ষে পিরোজপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের গণিতের সহকারী শিক্ষক আরাফাতুর রহমান অষ্টম শ্রেণির প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থীকে কোচিং করাচ্ছিলেন। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষকদের নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করানোর সুযোগ না থাকলেও ওই শিক্ষক নিয়মিত কোচিং করাচ্ছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে সাংবাদিকরা সেখানে সংবাদ সংগ্রহ ও ভিডিও ধারণ করতে যান।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, কোচিং কার্যক্রমের ভিডিও ধারণের সময় শিক্ষক আরাফাতুর রহমান সাংবাদিকদের বাধা দেন। একপর্যায়ে স্টার নিউজ ও দৈনিক নয়া দিগন্তের পিরোজপুর জেলা প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম মাসুদকে কলার ধরে টেনে কক্ষের ভেতরে নিয়ে যান তিনি।
চ্যানেল এস-এর পিরোজপুর প্রতিনিধি জিয়াউল হক অভিযোগ করে বলেন, “অবৈধ কোচিংয়ের তথ্য সংগ্রহের জন্য সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ভিডিও ধারণ করতে গেলে শিক্ষক আরাফাত স্টার নিউজ ও দৈনিক নয়া দিগন্তের সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম মাসুদকে কলার ধরে টেনে রুমের মধ্যে নিয়ে যান। তখন আমি এবং চ্যানেল ওয়ানের জেলা প্রতিনিধি শাফিউল মিল্লাত সহকর্মীকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে গেলে আরাফাত আমাকে স্টিলের স্কেল দিয়ে ডান হাতের কবজির ওপর আঘাত করেন। এতে আমার হাত রক্তাক্ত হয়। একই সময়ে শাফিউল মিল্লাতকেও ধাক্কা দেওয়া হয়।”
জিয়াউল হক আরও বলেন, “নিউজ সংগ্রহ করতে গিয়ে যদি আমাদের হামলার শিকার হতে হয়, তাহলে আমরা নিরাপত্তা চাইবো কার কাছে?”
হামলায় স্টার নিউজ ও দৈনিক নয়া দিগন্তের পিরোজপুর জেলা প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম মাসুদ, চ্যানেল ওয়ানের পিরোজপুর জেলা প্রতিনিধি শাফিউল মিল্লাত এবং চ্যানেল এস-এর পিরোজপুর প্রতিনিধি জিয়াউল হক আহত হন বলে জানা গেছে। পরে তারা পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
এ ঘটনায় শফিকুল ইসলাম মাসুদের পক্ষ থেকে পিরোজপুর সদর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার বিষয়ে জেলা প্রশাসক এবং পিরোজপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বরাবরও লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ বলেন, “আমরা গুরুত্বের সঙ্গে অভিযোগ গ্রহণ করেছি। তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
কোচিং করানোর অভিযোগের বিষয়ে পিরোজপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবর তালুকদার বলেন, “সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক কোচিং করা থেকে বিরত থাকার জন্য ইতোমধ্যে আমি আমার শিক্ষকদের নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছি। নিষেধ করা সত্ত্বেও শিক্ষকরা কীভাবে কোচিং করছেন, সেটা আমার জানা নেই।”
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় সদর থানায় দেওয়া অভিযোগের বিষয়ে পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, “কোচিং সেন্টারের নিউজ সংগ্রহের জন্য গিয়ে শিক্ষক কর্তৃক সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়েছে মর্মে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে সাংবাদিকদের ওপর হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাংবাদিকরা সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে কোচিং পরিচালনার অভিযোগ তদন্তের পাশাপাশি সংবাদ সংগ্রহে বাধা, হামলা ও হুমকির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সাংবাদিকদের ভাষ্য, সংবাদ সংগ্রহের মতো দায়িত্বশীল পেশাগত কাজে গিয়ে সাংবাদিকদের যদি হামলা ও হয়রানির শিকার হতে হয়, তাহলে মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দেয়। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হলে কলম বিরতিসহ কঠোর কর্মসূচি নেওয়ার সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও জানিয়েছেন তারা।

