মানসম্মত শিক্ষা, পেশাগত মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা: ঠাকুরগাঁওয়ে শিক্ষক ফোরামের নতুন পথচলা
জসীমউদ্দিন ইতি ঠাকুরগাঁও।
একটি জাতির সার্বিক অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হলো শিক্ষা। আর সেই মানসম্মত শিক্ষার মূল ভিত্তি রচিত হয় মাধ্যমিক পর্যায়ে। বাংলাদেশে মাধ্যমিক শিক্ষার সিংহভাগ দায়িত্ব বহন করে আসছে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের গণ্ডি পর্যন্ত কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের আলো জ্বালানোর পেছনে যেসব প্রধান শিক্ষক দিনরাত শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের ত্যাগ ও অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম সত্য হলো—জাতীয় অগ্রগতিতে এমন অভাবনীয় ভূমিকা রাখা সত্ত্বেও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকমণ্ডলী আজও নানাবিধ কাঠামোগত বৈষম্য, সামাজিক অনাদর ও পেশাগত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।
এমন এক জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ঠাকুরগাঁওয়ে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক ফোরামের জেলা, সদর উপজেলা এবং ভুল্লি উপজেলা শাখার ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়া অত্যন্ত সময়োপযোগী, তাৎপর্যপূর্ণ ও আশাব্যঞ্জক ঘটনা। শহরের জে আর সেন্টারে আয়োজিত এ সম্মেলনে জেলার অভিজ্ঞ প্রধান শিক্ষকদের বিপুল উপস্থিতি এবং জেলা ও বিভিন্ন উপজেলার নেতৃত্ব নির্বাচনের যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তা স্থানীয় শিক্ষাঙ্গনে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে।
নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন ।
সম্মেলনে ঠাকুরগাঁও জেলা শাখা (৩৯ সদস্য), সদর উপজেলা শাখা (২৩ সদস্য) এবং নতুন ভুল্লি উপজেলা শাখা (২৩ সদস্য)—এই তিনটি ইউনিটে যোগ্য ও দক্ষ সর্বসম্মত নেতৃত্ব নির্বাচন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এই নেতৃত্বের দায়িত্ব কেবল একটি নির্বাচিত কমিটি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন গঠিত ফোরামকে এটি অনুধাবন করতে হবে যে, নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা শুরু হলো এখন।
বর্তমানে মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, শ্রেণীকক্ষে গুণগত শিক্ষাদান নিশ্চিত করা, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার কমানো এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নীতি-নৈতিকতার চর্চা বাড়ানো—প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষকদের ভূমিকা অভিভাবকতুল্য। নবনির্বাচিত কমিটিগুলো যদি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনেই সীমাবদ্ধ না থেকে বিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক পরিবেশ তদারকি ও গুণগত পরিবর্তনের দিকে নজর দেয়, তবেই এই সম্মেলনের আসল সার্থকতা ফুটে উঠবে।
অধিকার আদায় ও পেশাগত মর্যাদার লড়াই
দীর্ঘদিন ধরে দেশের বেসরকারি শিক্ষক সমাজ নানা যৌক্তিক দাবি-দাওয়া নিয়ে সোচ্চার। চাকরি স্থায়ীকরণ, বদলি প্রথা চালু, সময়োপযোগী উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি এবং প্রধান শিক্ষকদের প্রশাসনিক ক্ষমতা ও পদের উপযুক্ত স্কেল প্রদান—এসবই আজ শিক্ষক সমাজের প্রাণের দাবি। অনেক সময় দেখা যায়, স্থানীয় পর্যায়ে প্রধান শিক্ষকেরা নানা ধরনের মানসিক চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব বা পরিচালনা পর্ষদের অযাচিত হস্তক্ষেপের শিকার হন।
এই পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ সংগঠন শিক্ষক সমাজের জন্য ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে। ঠাকুরগাঁও জেলা ও উপজেলার নবনির্বাচিত নেতৃবৃন্দ যে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের এবং অধিকার আদায়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা তৃণমূলের শিক্ষকদের মনে সাহস জোগাবে। নিজের পেশাগত মর্যাদা রক্ষা করতে না পারলে একজন শিক্ষক কখনোই মন খুলে পাঠদান করতে পারেন না। তাই শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবি আদায়ে এই ফোরামকে স্থানীয় প্রশাসন ও জাতীয় পর্যায়ের সাথে ইতিবাচক ও দৃঢ় সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক সমন্বয়
সম্মেলনে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষক প্রতিনিধিদের ইতিবাচক অংশগ্রহণ এটিই প্রমাণ করে যে, শিক্ষা খাতের উন্নয়ন কোনো একক গোষ্ঠীর পক্ষে সম্ভব নয়। প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিদের বক্তব্যে শিক্ষক সমাজের মর্যাদার বিষয়টি যেভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, তা ধরে রাখা প্রয়োজন। তবে শিক্ষক ফোরামকে সব সময় দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও পেশাদার মনোভাব বজায় রাখতে হবে, যাতে সর্বস্তরের শিক্ষক এই সংগঠনের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারেন।
প্রত্যাশা ও আগামী দিনের পথরেখা
পুরাতন ঠাকুরগাঁও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ রমজান আলী, জামালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ ফারুক হোসেন, মথুরাপুর পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের মোঃ আলমগীর, মিলনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের মোঃ আব্দুল হামিদ, কুমারপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের মোঃ ইলিয়াস আলী এবং লাউথুতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মোঃ ফজলুল হকসহ সকল নবনির্বাচিত প্রতিনিধিকে আমরা আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।
আমরা আশা রাখি, নবনির্বাচিত এই নতুন নেতৃত্ব কেবল কাগুজে দাপ্তরিক কাজের মধ্যে নিজেদের আবদ্ধ রাখবেন না। তাঁরা ঠাকুরগাঁওয়ের প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা আনবেন, শিক্ষকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন এবং সর্বোপরি ঠাকুরগাঁও জেলাকে শিক্ষা ক্ষেত্রে পুরো দেশের মধ্যে একটি অনন্য মডেলে পরিণত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন।
শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষা হলে জাতির শিক্ষাব্যবস্থা সুদৃঢ় হয়—এই সত্যকে ধারণ করেই ফোরামের আগামী দিনের পথচলা সাফল্যমণ্ডিত হোক।
যদি এই কলামে কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক বা আঞ্চলিক ইস্যু আরও যোগ করতে চান, তবে জানাবেন!

