বটিয়াঘাটায় গোবিন্দ বাড়ৈর রহস্যজনক মৃত্যু—দিন যত যাচ্ছে, ততই কি আড়ালে যাচ্ছে আসল রহস্য? পর্ব-৬

সেখ রাসেল, বিভাগীয় ব্যুরো চিফ, খুলনা:

খুলনার বটিয়াঘাটা থানার অদূরে ২নং বটিয়াঘাটা ইউনিয়নের কিসমত ফুলতলা সিলিন্দামারী এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী/বাসিন্দা গোবিন্দ বাড়ৈর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা যেন দিন দিন স্তিমিত হয়ে আসছে। ঘটনার পর বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে এলেও সেসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো মিলেছে কি না—তা নিয়েই স্থানীয়দের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা।

জানা গেছে, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ গোবিন্দ বাড়ৈর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। পরদিন ১৭ সেপ্টেম্বর তার স্ত্রী পলি মল্লিক বাদী হয়ে বটিয়াঘাটা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি মামলা নং-৬ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে সময় যত গড়াচ্ছে, ঘটনাটির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের আগ্রহ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেই দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। সাংবাদিকরা এ বিষয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলতে গেলে অনেকেই নানা ব্যস্ততার কথা বলে এড়িয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে গোবিন্দ বাড়ৈর স্ত্রী পলি মল্লিক ও কন্যা পূর্বা বাড়ৈর ভূমিকা ও আগ্রহ নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা চলছে।

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো আলোচনায় : গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুকে ঘিরে শুরু থেকেই কয়েকটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এগুলোর উত্তর তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রথমত—গোবিন্দ বাড়ৈর কাছে নগদ অর্থ থাকার বিষয়টি কারা জানত? কারা, কীভাবে এবং কার কাছ থেকে তার কাছে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ থাকার তথ্য জানতে পেরেছিল—এ প্রশ্নের উত্তর কি তদন্তে উঠে এসেছে?

দ্বিতীয়ত—চাঁদা দাবির বিষয়টি কতটা সত্য? কাদের পক্ষ থেকে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল এবং কেনই বা তার কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল—এ বিষয়টিও তদন্তের আওতায় এসেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তৃতীয়ত—মৃত্যুর আগে তার শারীরিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র কী ছিল? যদি তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে পড়ে গিয়ে থাকেন, তাহলে মাথার পেছনের দিকে আঘাত ও রক্তক্ষরণের বিষয়টি কীভাবে ঘটল? শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন থাকলে সেগুলোর উৎস কী—এ প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।

পুকুরঘাটের ঘটনাকে ঘিরেও নানা প্রশ্ন? গোবিন্দ বাড়ৈর কন্যা পূর্বা বাড়ৈর বক্তব্য অনুযায়ী, তার বাবা পুকুরঘাটে পড়ে ছিলেন এবং তাকে পিছন দিক থেকে ধরে টেনে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।

কিন্তু এখানেই উঠছে আরও কিছু প্রশ্ন—পুকুরঘাট থেকে তাকে বাড়িতে আনার সময় রাস্তায় বা পুকুরঘাটে রক্তের কোনো চিহ্ন ছিল কি না?
যদি মাথা থেকে রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে, তাহলে তাকে টেনে আনার সময় তার পরনের কাপড় বা তাকে বহনকারী ব্যক্তির পোশাকে রক্তের দাগ পড়েছিল কি না? মাথার রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে গামছা দিয়ে বেঁধে দেওয়ার কথা বলা হয়ে থাকলে, সেই গামছায় রক্তের চিহ্ন ছিল কি না?

আরও একটি প্রশ্ন স্থানীয়ভাবে আলোচিত হচ্ছে—পূর্বা কীভাবে জানতে পারলেন যে তার বাবা পুকুরঘাটে পড়ে আছেন? তাকে পুকুরঘাটে পাওয়ার পর কেন বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আশপাশের লোকজনকে জানানো বা চিৎকার-চেঁচামেচি করা হয়নি—এ বিষয়টিও তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

হাসপাতালে নেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন : ঘটনার পর হাসপাতালে নেওয়ার প্রসঙ্গ উঠলে “ডাক্তারকে কী বলবে?”—এ ধরনের প্রশ্ন কেন করা হয়েছিল, সেটিও এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও একটি বিষয়: তার নিজস্ব ফোন দিয়ে না ডেকে কেনো তার পিতার ফোন দিয়ে ডাকলো? এ বিষয়গুলো সাধারণত এমন হয় যে, যে ব্যক্তিকে ফোন করেছে সে দোষি নয়তো তাকে ফাঁসানোর জন্য।

তবে এসব প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর একমাত্র নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, চিকিৎসা নথি, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

ময়নাতদন্তের পর দ্রুত দাহ—কেন? গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুর পর তার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই মরদেহ দাহ করা হয়।

ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কী বলছে? মৃত্যুর সঠিক কারণ কী উল্লেখ করা হয়েছে? শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে কি না? ময়নাতদন্তের রিপোর্টের সঙ্গে ঘটনাস্থলের বর্ণনা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের মিল রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটি রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।

তদন্তে কি সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে? গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে যেসব প্রশ্ন ও আলোচনা রয়েছে, তার সবগুলোই যে সত্য—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। আবার কোনো প্রশ্নকে উপেক্ষা করার সুযোগও নেই।

কারণ একটি মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ঘটনাস্থল, আলামত, চিকিৎসা প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, কল রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য—সবকিছু মিলিয়েই প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা সম্ভব।

স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন—সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুর ঘটনাটি কি ধীরে ধীরে আলোচনার আড়ালে চলে যাচ্ছে? নাকি তদন্তের ভেতরেই প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের কাজ চলছে?

সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে আলামত : অতীতে দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন অনেক রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো সময়ের ব্যবধানে মানুষের স্মৃতি ও আলোচনার বাইরে চলে গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আলামতও সময়ের সঙ্গে নষ্ট বা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুর ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা—কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে দায়ী না করে, প্রতিটি প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।

পরিবারের বক্তব্য, স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য, চিকিৎসা ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য আলামত যাচাই করে প্রকৃত সত্য সামনে আনা হোক। গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যু কি স্বাভাবিক, দুর্ঘটনাজনিত, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা নয়; বরং যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *