বটিয়াঘাটায় একই দিনে দুই বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার, শোকে স্তব্ধ মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা ও এলাকাবাসী
সেখ রাসেল, বিভাগীয় ব্যুরো চিফ, খুলনা:
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বটিয়াঘাটায় একই দিনে দুই বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও মুজিবনগর সরকারের দায়িত্ব পালনকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা হরেন্দ্রনাথ গাইন (৭৯), অন্যদিকে উপজেলার একমাত্র নারী বীর মুক্তিযোদ্ধা শান্তিলতা গঙ্গা (৭৫) একই দিনে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন এই দুই গর্বিত সন্তান।
মৃত্যুর পর তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয় যথাযোগ্য সম্মান। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পৃথকভাবে দুজনকেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তাঁদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
উক্ত রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদানের সময় উপস্থিত ছিলেন, শোয়েভ-শাত-ঈল ইভান, সহকারী কমিশনার ভূমি, বটিয়াঘাটা উপজেলা। মারুফ হোসেন, অফিসার ইনচার্জ, বটিয়াঘাটা, থানা। বীর মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌস শেখ ও মনোরঞ্জন মন্ডল সহ আরও অনেকে।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বুকে নিয়ে চলে গেলেন হরেন্দ্রনাথ :
বীর মুক্তিযোদ্ধা হরেন্দ্রনাথ গাইন ছিলেন বটিয়াঘাটা উপজেলার ১ নম্বর জলমা ইউনিয়নের দাউনিফাদ গ্রামের কৃতী সন্তান। কর্মজীবনে তিনি খুলনা দক্ষিণের সাবেক পোস্ট মাস্টার জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বার্ধক্যজনিত কারণে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।
জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় হরেন্দ্রনাথ গাইন মুজিবনগর সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে সরকারি বীর মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনি ছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চুকনগরে শহীদ হওয়া অভিনাস গাইনের মেজ ছেলে। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এ সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তাঁর মরদেহে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনাও করা হয়। পরে দুপুরে ছয়ঘরিয়া মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। গার্ড অব অনার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শোয়েব শাত-ঈল ইভান, বটিয়াঘাটা থানার অফিসার ইনচার্জ মারুফ হোসেন, বটিয়াঘাটা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা বিনয় কৃষ্ণ সরকারসহ স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
বটিয়াঘাটার একমাত্র নারী বীর মুক্তিযোদ্ধা শান্তিলতার বিদায়:
অন্যদিকে একই দিনে না ফেরার দেশে চলে যান বটিয়াঘাটা উপজেলার একমাত্র নারী বীর মুক্তিযোদ্ধা শান্তিলতা গঙ্গা (৭৫)। তিনি গঙ্গারামপুর ইউনিয়নের বয়ারবাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা ছিলেন এবং নিজ বাসভবনেই মৃত্যুবরণ করেন। শান্তিলতা গঙ্গাও মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে সরকারি গেজেটে নারী বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। বৃহস্পতিবার উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাঁকেও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাঁকে শেষ বিদায় জানান স্বজন, সহযোদ্ধা ও স্থানীয়রা। পরে বয়ারবাঙ্গা মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
একই দিনে দুই বিদায়, স্মৃতিতে অমর দুই যোদ্ধা:
একই দিনে বটিয়াঘাটার দুই বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু স্থানীয়দের মনে গভীর শোকের জন্ম দিয়েছে। যাঁরা একাত্তরের উত্তাল সময়ে দেশের জন্য নিজেদের জীবন ও শ্রম উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁদের বিদায়ে শোকাহত হয়ে পড়েছেন মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, সহযোদ্ধা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
স্থানীয়রা বলেন, হরেন্দ্রনাথ গাইন ও শান্তিলতা গঙ্গার চলে যাওয়া শুধু দুটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি বটিয়াঘাটার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেরও একটি অধ্যায়ের অবসান। তাঁদের কর্ম, ত্যাগ ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দুই বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাঁরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে প্রয়াতদের আত্মার শান্তি কামনা করেছেন।

