আদর্শ শিক্ষকের রাজকীয় বিদায়: ক্ষীয়মাণ মূল্যবোধের সমাজে এক আলোর মশাল
– জসীমউদ্দিন ইতি
সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার গিলাবাড়ী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: শাহজাহান ই হাবিবের বিদায় সংবর্ধনার যে চিত্র আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি, তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বিদায় অনুষ্ঠান ছিল না; বরং তা ছিল একজন সত্যিকারের আলোকবর্তিকার প্রতি সমাজের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার এক অনন্য দলিল। ফুলের পাঁপড়ি ছিটানো লাল গালিচা সংবর্ধনা, সহকর্মী-শিক্ষার্থীদের অবাধ্য অশ্রুসিক্ত চোখ আর সুসজ্জিত প্রাইভেট কারে করে সপরিবারে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার এই রাজকীয় আয়োজন প্রমাণ করে—যুগ যতই পাল্টাক, সমাজ আজও তার প্রকৃত গুণী মানুষকে সম্মান জানাতে ভোলেনি।
বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে যখন শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের চরম অবক্ষয়, প্রাতিষ্ঠানিক দলাদলি, অনিয়ম আর শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের নানা নেতিবাচক খবর আমাদের প্রতিনিয়ত খবরের কাগজে ব্যথিত করে, ঠিক তখনই ঠাকুরগাঁওয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই ঘটনাটি আমাদের এক গভীর আশার আলো দেখায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজ এখনো পুরোপুরি পচে যায়নি; সততা ও নিষ্ঠার মূল্যায়ন আজও এ দেশের মাটিতে টিকে আছে।
দীর্ঘ ৩২ বছরের কর্মজীবনে বিদায়ী এই প্রধান শিক্ষক নিজেকে কেবল একটি ভবনের চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি হয়ে উঠেছিলেন পুরো উপজেলার এক আলোর দিশারী। ‘দিনের কাজ দিনেই শেষ করা’র মতো নিষ্ঠা ও সততার যে নজির তিনি স্থাপন করেছেন, তা আজকের ফাইল আটকে রাখার আমলাতান্ত্রিক ও করপোরেট সংস্কৃতির যুগে যেকোনো পেশাজীবীর জন্য এক মহান শিক্ষা। তিনি কাজকে ভালোবেসেছিলেন, আর সেই কাজই আজ তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে।
একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক যখন তাঁর সততা ও যোগ্যতার জোরে জেলায় ‘শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক’ নির্বাচিত হন এবং তাঁর প্রিয় প্রতিষ্ঠান ‘শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়’ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পায়, তখন বুঝতে হবে সেই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক মহাসাধকের নীরব শ্রম ও আত্মত্যাগ। আর এই শ্রমের প্রতিদান সমাজ কীভাবে দেয়, তা প্রমাণিত হলো তাঁর বিদায়লগ্নে। দুই শতাধিক অন্য বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের উপস্থিতি এবং হাজারো সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া জল কেবল একজন ব্যক্তির বিদায়কে মহিমান্বিত করেনি, বরং গোটা শিক্ষক সমাজকে এক অনন্য মর্যাদার আসনে আসীন করেছে। এটি প্রমাণ করেছে, শিক্ষকের আসল শক্তি চেয়ার বা ক্ষমতা নয়, তাঁর আসল শক্তি হলো মানুষের ভালোবাসা।
(মূল্যবোধের আকাল ও শিক্ষকের সামাজিক স্থান)
আমাদের সমাজ ব্যবস্থা আজ এক ক্রান্তিকাল পার করছে। চারদিকে যখন ক্ষমতার দাপট আর বিত্ত-বৈভবের জয়গান, তখন একজন সাধারণ শিক্ষকের এমন রাজকীয় বিদায় এক নীরব বিপ্লবের সমতুল্য। আমরা প্রায়ই বলি, শিক্ষকেরা সমাজের আলোকবর্তিকা। কিন্তু বাস্তবে আমরা তাঁদের কতটা মূল্যায়ন করতে পারছি? একজন প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক যে পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করে একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলেন, অর্থনৈতিক বা সামাজিক কাঠামোর দিক থেকে কি তাঁরা সেই প্রাপ্য সম্মান পান? এই প্রশ্নটি কিন্তু অধরাই থেকে যায়।
গিলাবাড়ী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি, শিক্ষকবৃন্দ এবং স্থানীয় এলাকাবাসী শাহজাহান ই হাবিবকে যেভাবে বিদায় জানিয়েছেন, তা রাষ্ট্র ও সমাজের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাঁরা দেখিয়েছেন, একজন শিক্ষককে বিদায় জানাতে কোনো কোটি টাকার বাজেট লাগে না, লাগে একটি সুন্দর মন এবং শিক্ষকের প্রতি প্রকৃত সম্মানবোধ। এই দৃষ্টান্ত দেশের অন্যান্য অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একটি বড় বার্তা।
(এক আলোর কারিগরের বিদায় ও আমাদের শূন্যতা)
শিক্ষকতা কেবল কোনো চাকরি বা জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়, এটি একটি পবিত্র ব্রত। একজন আদর্শ শিক্ষক একটি প্রজন্মের মগজে ও মননে সততা, দেশপ্রেম ও মানবিকতার বীজ বুনে দেন। মো: শাহজাহান ই হাবিবের মতো কাজপাগল ও সৎ শিক্ষকেরা যখন নিয়মের বেড়াজালে অবসরে যান, তখন প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা হয়তো কোনো নতুন নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ হয়, কিন্তু তাঁর তৈরি করা আদর্শের যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
বিদায় বেলায় এই গুণী শিক্ষকের সেই আবেগঘন উক্তি আমাদের স্পর্শ করে, যেখানে তিনি বলেছেন—”সমাজ আমাকে যে সম্মান দিয়েছে, তাতে আমি আপ্লুত। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই বিদ্যালয়ের সকল ভালো কাজের সাথে থাকবো।” এই উক্তিই বলে দেয়, একজন শিক্ষকের দায়িত্ববোধ কখনো পেনশনের কাগজে সই করার মাধ্যমে শেষ হয়ে যায় না। শিক্ষক আজীবনই শিক্ষক।
আমরা মনে করি, ঠাকুরগাঁওয়ের গিলাবাড়ী স্কুলের এই সুন্দর ও গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেশের প্রতিটি বিদ্যাপীঠে ছড়িয়ে পড়া উচিত। এই রাজকীয় বিদায় কেবল একটি অঞ্চলের জন্য গর্বের নয়, এটি গোটা দেশের শিক্ষাঙ্গনের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে আমাদের দাবি, শিক্ষকদের মর্যাদা কেবল কাগজে-কলমে বা দিবসভিত্তিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে, তাঁদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।
বিদায়ী এই গুণী শিক্ষকের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও শান্তিময় অবসর জীবন কামনা করি। তাঁর জ্বালিয়ে যাওয়া আলোর মশাল যেন গিলাবাড়ী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়সহ পুরো ঠাকুরগাঁওয়ের শিক্ষাঙ্গনকে আরও বহুকাল আলোকিত করে রাখে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। শিক্ষকদের মর্যাদা ফিরে আসুক তাঁদের আপন মহিমায়, সমাজ ফিরে পাক তার নৈতিকতার সুবর্ণ অতীত।

