শেখ হাসিনাকে ভারতে ঢুকতে দেওয়া ছাড়া ‘বিকল্প ছিল না’: দীনেশ ত্রিবেদী
সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক:
শেখ হাসিনাকে ভারতে ঢুকতে দেওয়া ছাড়া ‘বিকল্প ছিল না’: দীনেশ ত্রিবেদী
প্রত্যর্পণ প্রশ্নে দিল্লির বার্তা—‘আইনি প্রক্রিয়া চলছে, সময়সীমা বলা সম্ভব নয়’; ২০২৪-এর সংকটের পেছনের পরিস্থিতিও ব্যাখ্যা করলেন ভারতীয় হাইকমিশনার
ঢাকা, ৩ অক্টোবর ২০২৬: শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের আগস্টে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে তৎকালীন সংকটময় পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, ওই মুহূর্তে নয়াদিল্লির সামনে কার্যত অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে যে প্রক্রিয়া চলছে, তা একটি আইনি ও কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়া এবং এতে আদালতও সম্পৃক্ত থাকায় এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বলা সম্ভব নয়।
শনিবার ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে শুরু হওয়া বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬-এর একটি কর্ম অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এসব কথা বলেন তিনি। তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। সম্মেলনটি ৩ থেকে ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
‘আমরা পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না’ শেখ হাসিনাকে ভারত কখন বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে—এমন প্রশ্নের জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তিনি তখনও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং তার ভারতে আসার পরিস্থিতির জন্য ভারত প্রস্তুত ছিল না।
তার বক্তব্যের সারকথা ছিল—বাংলাদেশে তখন যে ধরনের মর্মান্তিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানকে ভারতে অবতরণের অনুমতি না দিলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিতে পারত। কী ঘটত, তা আগে থেকে বলা সম্ভব ছিল না।
ভারতীয় হাইকমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে ভারতীয় বিমানবাহিনী কিংবা ভারতীয় সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে যায়নি। তিনি বাংলাদেশের একটি সামরিক বিমানে করে ভারতে পৌঁছান।
প্রত্যর্পণে ‘টাইমফ্রেম’ নেই শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বিষয়টি এখন একটি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আগেও জানিয়েছে যে বাংলাদেশের অনুরোধ চলমান বিচারিক ও অভ্যন্তরীণ আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। আদালত সংশ্লিষ্ট থাকায় কখন এই প্রক্রিয়া শেষ হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ্য অবস্থানও এ বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, বাংলাদেশ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ পাঠিয়েছে এবং সেটি চলমান বিচারিক ও অভ্যন্তরীণ আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল ও জুলাইয়েও ভারত একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
প্রত্যর্পণের পেছনে রয়েছে দ্বিপক্ষীয় আইনি কাঠামো : বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ বিষয়ে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি রয়েছে। ২০১৩ সালে দুই দেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং ২০১৬ সালে চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা সংশোধন করা হয়। ভারতীয় সরকারি নথিতেও এ সংশোধনের উল্লেখ রয়েছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ জানিয়েছিল, শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার সর্বশেষ অনুরোধটি বিদ্যমান ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতাতেই করা হয়েছে। অর্থাৎ, বিষয়টি এখন কেবল রাজনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামো ও বিচারিক প্রক্রিয়াও জড়িত।
‘প্রতিবেশী অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না’ শেখ হাসিনার বিষয়টির বাইরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্নের মুখোমুখি হন দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ এবং কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলবে বা বজায় রাখবে—সেটি বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। একজন প্রকৃত প্রতিবেশী অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিতে হস্তক্ষেপ করে না—এমন বক্তব্যও দেন তিনি।
একই অধিবেশনে ত্রিবেদী দুই দেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিত আলোচনা, পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের ওপর গুরুত্ব দেন। পানি, বাণিজ্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, যোগাযোগ ও পরিবহনসহ বিভিন্ন বিষয়ে উপযুক্ত দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কে নতুন সমীকরণ? শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান বাংলাদেশের রাজনীতি ও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে আছে। ২০২৪ সালের আগস্টে তার ভারতে যাওয়ার পর থেকেই প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় জায়গা করে নেয়।
এরপর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে ফেরত চেয়ে দিল্লির কাছে একাধিকবার যোগাযোগ করেছে। ভারতের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য বক্তব্যে এখন পর্যন্ত যে অবস্থানটি স্পষ্ট হয়েছে তা হলো—অনুরোধটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং সেটি প্রচলিত আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
৩ অক্টোবর ঢাকায় দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে সেই অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হলো ২০২৪ সালের সংকটের একটি কূটনৈতিক ব্যাখ্যাও: ভারত বলছে, সে সময় শেখ হাসিনাকে বহনকারী বাংলাদেশি সামরিক বিমানকে অবতরণের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল একটি আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মধ্যে।
এখন প্রশ্ন একটাই—আইনি প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে? তার উত্তর অবশ্য আজও দিল্লির কাছে নির্দিষ্ট নয়।দীনেশ ত্রিবেদীর ভাষায়, আদালত যখন প্রক্রিয়ার অংশ, তখন এর সময়সীমা আগে থেকে নির্ধারণ করা যায় না।

