বটিয়াঘাটায় গোবিন্দ বাড়ৈয়ের মৃত্যুর রহস্য কি অজানায় থেকে যাবে, ময়না তদন্ত রিপোর্ট কি বদলানো সম্ভব?-পর্ব ৫

সেখ রাসেল, বিভাগীয় ব্যুরো চিফ, খুলনা:
খুলনার বটিয়াঘাটা কিসমত ফুলতলা সিলিন্দামারী এলাকার মৃত হরিপদ বাড়ৈ এর পুত্র গোবিন্দ বাড়ৈ ইং ১৬/০৯/২৬ তারিখ সন্ধ্যায় তার মৃত্যু/হত্যার ঘটনার পরের দিন ১৭/০৯/২৬ তারিখ তার স্ত্রী বাদী হয়ে বটিয়াঘাটা থানায় এজাহার দায়ের করেছে। যার নং-০৬।

আজ ০২/১০/২০২৬ তারিখ মৃত্যু/হত্যার ১৭ দিন পেরিয়ে গেলেও মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। তার আত্মার শান্তির জন্য বাড়ীতে ৪/৫ শত লোকের আয়োজনে শ্রাদ্ধ শ্রান্তি হচ্ছে। এটা দোষের কিছু নয়, তাদের ধর্মীয় রীতি নীতির বিষয়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: গোবিন্দ বাড়ৈ এর লাশ পূনরায় আবার ময়না তদন্ত করবেন, সে সুযোগ খুবই কম, তার লাশ দাহ করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন দ্রুত দাহ কি কোন এক প্রমাণকে আড়াল করার জন্য? না কি কারো চাপে পড়ে তার পরিবার দ্রুত দাহ করতে বাধ্য হয়েছে? যদি স্টোক করে মৃত্যু হয় তাহলে তার মাথায় কেন আঘাতের চিহ্ন ও কেনই বা তার মাথা থেকে অনেক রক্ত ঝরলো এবং কেনই বা শরীরেও আঘাতের চিহ্ন।

তবে স্থানীয়দের মাঝে নানামূখী আলোচনা সমালোচনার মধ্যে একটি বিষয় সামনে আনা প্রয়োজন। তার জমি ক্রয়-বিক্রয়ের নগদ অর্থের কথা কে বা কারা জানতো? শোনা যাচ্ছে, মৃতের নিকট কে বা কাহারা চাঁদা দাবি করেছিলো? বিষয়টি সত্য কিনা? সত্য হলে তার সাথে মৃত্যুর আগে বা মৃত্যুর দিন তার বা আশে পাশের বাড়ীতে কে বা কাহারা যাওয়া আসা করেছে? তারা কারা?

ময়না তদন্তে যদি হত্যা স্বাব্যস্ত হয়, তাহলে তার সাথে কে বা কারা জড়িত? কিভাবে তাকে মারা হয়েছে? কি কারণে হত্যা হয়েছে? এমন নানাবিধ প্রশ্ন সামনে নিয়ে প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে নতুন করে মাঠে নামতে হবে প্রশাসনকে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আগে পরিষ্কার করা দরকার: বাংলাদেশে ১৯৭১–২০২৬ পর্যন্ত ভুল/মিথ্যা ময়নাতদন্তের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনা:
১. হেনা আক্তার মামলা — শরীয়তপুর, ২০১১: ঘটনা: ১৪/১৫ বছর বয়সী হেনা আক্তারকে ২০১১ সালের ২৪ জানুয়ারি শরীয়তপুরের নড়িয়ায় সালিশের নামে মারধর করা হয় এবং ৩১ জানুয়ারি তিনি মারা যান। প্রথম ময়নাতদন্তে শরীরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ আঘাতের চিহ্ন উল্লেখ করা হয়নি। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায় এবং মৃত্যুর কারণ হিসেবে আঘাতজনিত রক্তক্ষরণ ও septicemic shock উল্লেখ করা হয়।
প্রথম ময়নাতদন্তের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক: গোলাম সারওয়ার — তৎকালীন শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন, ডা. নির্মল চন্দ্র দাস — তৎকালীন Resident Medical Officer, ডা. রাজেশ মজুমদার — Medical Officer, ডা. হোসনে আরা — Medical Officer, শরীয়তপুর জেনারেল হাসপাতাল। তাদের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট ২৮ মার্চ ২০১১ তারিখ ফৌজদারি কার্যক্রম নেওয়ার নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ৫ মে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের তাঁদের বিরুদ্ধে prosecution করার নির্দেশ বহাল রাখে।

২. ওয়াহিদা সিফাত মামলা — রাজশাহী, ২০১৫
মৃত্যু: ২৯ মার্চ ২০১৫, রাজশাহী শহরের মহিষবাথান এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে ওয়াহিদা সিফাতের মৃত্যু হয়। প্রথম ময়নাতদন্ত: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক ডা. জুবায়দুর রহমান প্রথম ময়নাতদন্ত করেন এবং মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। পরবর্তী সময়ে লাশ কবর থেকে তুলে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত করা হলে শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায় এবং দ্বিতীয় প্রতিবেদনে হত্যার আলামত পাওয়া যায়। ডা. জুবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রথম ট্রায়াল কোর্টের রায়, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭: কিন্তু বিষয়টি এখানেই শেষ হয়নি। হাইকোর্ট ২০২০ সালে ওই ট্রায়াল কোর্টের রায় বাতিল করে পুনর্বিচারের নির্দেশ দেয়।

৩. চম্পা ধর্ষণ ও হত্যা মামলা — রাজশাহী ২০১৬ সালের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে চম্পা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রথম ময়নাতদন্ত নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠার কথা প্রকাশিত হয়। পরবর্তী ময়নাতদন্তে ধর্ষণ ও হত্যার বিষয় উঠে আসে এবং ২০১৫ সালের ১৭ নভেম্বর আদালত চারজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথম ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

৪. পটুয়াখালী — সীমা হত্যা/ধর্ষণ মামলা, ২০১৯, আদালত সরাসরি ময়নাতদন্ত রিপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পটুয়াখালীর সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সীমা-র ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনায় দেওয়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুকে “antemortem and accidental” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। হাইকোর্ট ২২ মে ২০১৯ ওই রিপোর্টকে “misleading postmortem report” হিসেবে উল্লেখ করে তদন্তের নির্দেশ দেয়। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক: ডা. শাহ মোজাহেদুল ইসলাম — তৎকালীন পটুয়াখালী সিভিল সার্জন।
তিনি আদালতে উপস্থিত হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চান। কিন্তু হাইকোর্ট তাঁর ক্ষমা গ্রহণ করেনি এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে তদন্তের নির্দেশ দেয়। দোষ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।

৫. ২০২৫ সালের গাজীপুর — টাকার বিনিময়ে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পরিবর্তনের অভিযোগ, তারিখ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৫, স্থান: শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, গাজীপুর। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এনফোর্সমেন্ট টিম সেখানে অভিযান চালিয়ে টাকার বিনিময়ে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পরিবর্তনের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানায়। ছদ্মবেশী দুদক কর্মকর্তারা ময়নাতদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা টাকা নিয়ে রিপোর্ট পরিবর্তনের আশ্বাস দেন। কথোপকথনে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র জব্দ করা হয়। অভিযানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে ফরেনসিক বিভাগের প্রধান মাজহারুল ইসলাম এবং কলেজের অধ্যক্ষ জোবায়দার সঙ্গে দুদকের কর্মকর্তারা কথা বলেন।

৬. আবু সাঈদ — ২০২৪ সালের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পরিবর্তনের অভিযোগ এটি আলাদা ধরনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক ডা. রাজিবুল ইসলাম ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, তিনি আবু সাঈদের ময়নাতদন্তের মূল রিপোর্টে একাধিক গুলির আঘাত ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কথা উল্লেখ করেছিলেন এবং মৃত্যুকে homicidal হিসেবে মত দিয়েছিলেন। তাঁর সাক্ষ্য অনুযায়ী, রিপোর্টটি গ্রহণ না করে তাঁকে বারবার নতুন করে রিপোর্ট দিতে চাপ দেওয়া হয়; তিনি বলেন, রিপোর্ট পাঁচবার পরিবর্তনের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। তবে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য: এটি “ডা. রাজিবুল ইসলাম ঘুষ নিয়ে ভুল রিপোর্ট দিয়েছেন” এমন ঘটনা নয়। বরং তাঁর নিজের আদালত-সাক্ষ্য অনুযায়ী তিনি চাপের মুখে রিপোর্ট পরিবর্তন করতে বাধ্য হওয়ার পরিস্থিতির কথা বলেছেন।

উপরের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে ভুল রিপোর্ট করা চিকিৎসকদের কারো কিন্তু বড় ধরণের জেল জরিমানা হয়েছে এমন তথ্য দিতে দিধাবোধ করেনা।

তবে স্থানীয়রা বর্তমান সরকার ও প্রশাসনের প্রতি জোড়ালো দাবি এর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে, প্রকৃত অপরাধীকে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *