ঠাকুরগাঁওয়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে পরিবারসহ শিক্ষক উধাও: ভারতে অবস্থানের তথ্য
জসীমউদ্দীন ইতি, ঠাকুরগাঁও
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার আটঘরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের হিন্দুধর্ম বিষয়ক সহকারী শিক্ষক তুলিন চন্দ্র রায় ব্যাংক, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এলাকার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরিবারসহ ভারতে উধাও হয়ে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁর এমপিও (MPO) স্থগিত করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রানীশংকৈল উপজেলার কাশিপুর গোয়াবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা তুলিন চন্দ্র রায় ২০০১ সালের নভেম্বর মাসে হরিপুর উপজেলার ১ নম্বর গেদুয়া ইউনিয়নের আটঘরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে হিন্দুধর্ম শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সুবাদে এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে তিনি বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিও থেকে বড় অঙ্কের ঋণ সুবিধাও গ্রহণ করেন।
তিনি ২০২৩ সালে সোনালী ব্যাংক হরিপুর শাখা থেকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা ঋণ নেন। এর পাশাপাশি হরিপুরের ‘সিএপিবি’ (CAPB) নামক একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে আরও ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ব্যাংক ও সংস্থার কিস্তি পরিশোধের অজুহাতে এবং ব্যক্তিগত সমস্যা দেখিয়ে স্থানীয় শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুকৌশলে মোটা অঙ্কের টাকা ধার নিতে থাকেন।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষকতার মতো সম্মানজনক পেশায় থাকার কারণে সবাই তাঁকে বিশ্বাস করে বড় অঙ্কের টাকা ধার দিয়েছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বিদ্যালয়েরই এক শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তিনি আমার কাছ থেকে নগদ ৪ লাখ টাকা ধার নেন। পরে জানতে পারি তিনি কেবল আমার নয়, বিদ্যালয়ের আরেক সহকর্মীর কাছ থেকে ৪ লাখ এবং অন্য এক কর্মচারীর কাছ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন।
এ ছাড়া স্থানীয় বেশ কয়েকজন সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছ থেকে স্ট্যাম্প ও মৌখিক চুক্তিতে বিভিন্ন মেয়াদের কথা বলে টাকা নিয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে তাঁর ঋণের পরিমাণ অর্ধকোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।
সব খাত থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা সংগ্রহের পর ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি পরিবারসহ আত্মগোপনে চলে যান। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, পাওনাদারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি রাতের আঁধারে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে গেছেন।
সম্প্রতি ভারতের বাজারে গিয়ে তাঁর দেখা পেয়েছেন—এলাকার এমন কয়েকজন যুবক জানান, পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ এলাকায় তুলিন চন্দ্র রায়কে তাঁরা ইজিবাইক (টোটো) চালাতে দেখেছেন। সেখানকার রাস্তায় কথা হলে তিনি সাধারণ কুশল বিনিময় করলেও নিজের বর্তমান স্থায়ী ঠিকানা প্রকাশ করেননি। এরপর থেকে তাঁর সাথে আর কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার বিষয়ে আটঘরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মনজুরুল ইসলাম বলেন, সাবেক প্রধান শিক্ষকের মেয়াদে ২০০১ সালে তিনি এই বিদ্যালয়ে যোগদান করেছিলেন। বিভিন্ন পাওনাদার ও ব্যাংকের লোকজন পাওনা টাকার জন্য বিদ্যালয়ে আসা শুরু করলে আমরা তাঁর এই বিশাল অঙ্কের ঋণের বিষয়টি জানতে পারি। ২০২৪ সাল থেকে তিনি বিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
তিনি আরও জানান, বিদ্যালয়ের নিয়ম ও সরকারি বিধি অনুযায়ী তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশসহ একাধিক চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তবে তাঁর পক্ষ থেকে কোনো জবাব না পাওয়ায় এবং তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে বর্তমানে তাঁর বেতন-ভাতা (এমপিও) পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে।
শিক্ষকের এমন কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত বিষয়টি তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় পাওনাদার ও সচেতন মহল।

