“সরকারি ত্রাণ নয়, টেকসই বেড়িবাঁধ চাই; সাময়িক সহায়তা নয়, স্থায়ী জীবিকার নিশ্চয়তা চাই”

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার:বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক অবিরাম যুদ্ধের জনপদ। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, বঙ্গোপসাগর, অসংখ্য নদ-নদী ও বিস্তীর্ণ উপকূলীয় জনপদ ঘিরে গড়ে ওঠা সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের মানুষের জীবন-জীবিকা যেমন প্রকৃতিনির্ভর, তেমনি প্রকৃতির বৈরিতার কাছেও সবচেয়ে বেশি অসহায়।

এ অঞ্চলের মানুষের কাছে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা কোনো নতুন শব্দ নয়। বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেই টিকে থাকতে হচ্ছে তাদের। একদিকে সুন্দরবন তাদের জীবিকার আশ্রয়, অন্যদিকে সেই সুন্দরবনে প্রবেশ করেই অনেককে বাঘের আক্রমণ, জলদস্যু ও নানা ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়। আবার নদী ও সাগরঘেঁষা হওয়ায় প্রতিটি দুর্যোগে হারাতে হয় ঘরবাড়ি, ফসল, মাছের ঘের, গবাদিপশু, স্বপ্ন ও সঞ্চয়।

সিডর থেকে রিমাল—দুর্যোগের ক্ষত যেন শুকায় না

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ভয়াল ঘূর্ণিঝড় সিডর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনে যে ক্ষত তৈরি করেছিল, তার রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। বিশেষ করে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা ছিল সিডরের ভয়াবহ আঘাতে বিপর্যস্ত জনপদগুলোর অন্যতম।

এরপর একে একে নার্গিস, আইলা, মহাসেন, রোয়ানু, ফণী, বুলবুল, আম্পান, মিধিলি এবং সর্বশেষ রিমালের মতো ঘূর্ণিঝড় উপকূলবাসীর জীবনকে বারবার বিপর্যস্ত করেছে।

প্রতিটি দুর্যোগের পর মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। ভেঙে যাওয়া ঘর আবার তুলেছে, ডুবে যাওয়া ঘের সংস্কার করেছে, লবণাক্ত জমিতে নতুন করে ফসল ফলানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু ক্ষত শুকানোর আগেই নতুন কোনো দুর্যোগ এসে তাদের সেই স্বপ্ন আবারও ভেঙে দিয়েছে।

রিমালে মোরেলগঞ্জে শত শত কোটি টাকার ক্ষতি

সর্বশেষ রিমালের তাণ্ডবে মোরেলগঞ্জে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। স্থানীয় বিভিন্ন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হাজার হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য, সড়ক যোগাযোগ, পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে।

মৎস্য খাতে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি হাজার হাজার চিংড়ি ঘের পানিতে তলিয়ে যায়। কৃষকের ফসল নষ্ট হয়। বিভিন্ন এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জলোচ্ছ্বাসের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে।

প্রতিবছর নদীভাঙন ঠেকাতে জিওব্যাগ ফেলে কিংবা সাময়িক সংস্কার করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে পরবর্তী জোয়ারেই আবার সেই বাঁধ ভেঙে যায়। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও স্থায়ী সমাধান হয় না। মানুষের ঘরবাড়ি, জমি ও সম্পদও থেকে যায় চরম ঝুঁকিতে।

‘সরকারি ত্রাণ নয়, টেকসই বেড়িবাঁধ চাই’

উপকূলবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি—ত্রাণনির্ভরতা নয়, প্রয়োজন স্থায়ী নিরাপত্তা।

দুর্যোগের পর খাদ্য, বস্ত্র ও অর্থ সহায়তা মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে পারে। কিন্তু একটি পরিবারকে বারবার ঘূর্ণিঝড়ের পর ত্রাণ দেওয়ার চেয়ে এমন একটি শক্তিশালী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা অনেক বেশি কার্যকর, যা তাদের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও জীবিকা রক্ষা করবে।

খরাস্রোতা নদীর তীরে মাটির বাঁধ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। তাই উপকূলের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।

লবণাক্ততায় হারিয়ে যাচ্ছে কৃষির ঐতিহ্য

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আরেকটি বড় সংকট হলো লবণাক্ততা। একসময় যে জমিতে ধান, পাট, শাকসবজি ও নানা কৃষিপণ্য উৎপাদিত হতো, সেই জমির বড় একটি অংশ এখন চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের আওতায়।

চিংড়ি চাষ একদিকে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত লবণাক্ততা কৃষিজমির স্বাভাবিক উৎপাদনক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক কৃষক জমি ইজারা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে নিজের জমিতেই অনেকে দিনমজুরে পরিণত হচ্ছেন।

এ পরিস্থিতি শুধু কৃষির সংকট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা, পারিবারিক অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।

সুন্দরবনই শেষ ভরসা, আবার সুন্দরবনই ঝুঁকির জায়গা

সাতক্ষীরার শ্যামনগর, গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ, দাঁতিনাখালীসহ বিভিন্ন এলাকার বহু মানুষ জীবিকার জন্য সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল।

কেউ মধু সংগ্রহ করেন, কেউ গোলপাতা, কেউ মাছ-কাঁকড়া ধরেন। বনজীবীরা জানেন, সুন্দরবনে প্রবেশ মানেই জীবনের ঝুঁকি। তবুও ক্ষুধা ও জীবিকার তাগিদে তাদের বনে যেতে হয়।

বাঘের আক্রমণে অনেক পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য ‘বাঘ বিধবা’ পরিবার। স্বামীকে হারানোর শোকের পাশাপাশি এসব নারীর অনেককে সামাজিক অবহেলা, অর্থনৈতিক সংকট ও নানা কুসংস্কারের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে।

তবুও তারা থেমে নেই। কেউ বসতভিটায় সবজি চাষ করছেন, কেউ দিনমজুরি করছেন, কেউ মাছ ধরছেন, আবার কেউ প্রশিক্ষণ নিয়ে বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করছেন।

সুপেয় পানির সংকট—অথই পানির মধ্যে এক ফোঁটা নিরাপদ পানি

উপকূলের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতাগুলোর একটি হলো সুপেয় পানির সংকট।

চারদিকে নদী, খাল ও জলরাশি—তবুও পান করার মতো নিরাপদ পানি পাওয়া কঠিন। লবণাক্ততার কারণে অনেক নলকূপ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে বিশেষ করে নারীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়।

পানি সংগ্রহে তাদের সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় হয়। দুর্যোগের সময় এই সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ফলে সুপেয় পানির নিশ্চয়তা উপকূলবাসীর কাছে এখন অন্যতম মৌলিক দাবি।

‘শুধু ঘর দিয়ে আমরা কী করব, আমাদের কাজ দেন’

জলবায়ু দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনে শুধু একটি ঘর তৈরি করে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। ঘর মানুষের মাথা গোঁজার জায়গা দেয়, কিন্তু জীবন চালাতে প্রয়োজন কর্মসংস্থান।

শ্যামনগরের বিভিন্ন পুনর্বাসন এলাকায় বসবাসকারী মানুষের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—তাদের অনেকেই কাজের অভাবে দীর্ঘ সময় বেকার থাকেন। কেউ জীবিকার সন্ধানে অন্য জেলায় চলে যান, কেউ মাসের পর মাস পরিবার থেকে দূরে থাকেন।

তাদের প্রত্যাশা খুবই সাধারণ—ত্রাণ নয়, কাজ।

কাজ থাকলে তারা নিজেদের পরিবার চালাতে পারবেন, সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারবেন এবং আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবেন।

দুর্যোগের সঙ্গে লড়াইয়ে বিকল্প জীবিকার সম্ভাবনা

সব প্রতিকূলতার মধ্যেও উপকূলের মানুষের মধ্যে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর অসাধারণ চেষ্টা রয়েছে।

বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতার মাধ্যমে কেউ কেওড়া ফল থেকে আচার, চকলেট ও জেল তৈরি করছেন; কেউ মৌচাক থেকে মোম ও সাবান তৈরি করছেন; কেউ মধু বাজারজাত করছেন। বসতভিটার সামান্য জমিতে লবণসহিষ্ণু সবজি উৎপাদনের উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে।

এসব ছোট উদ্যোগই প্রমাণ করে—সুযোগ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও বাজারসংযোগ দেওয়া হলে উপকূলের মানুষ নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই বদলাতে সক্ষম।

জলবায়ু উদ্বাস্তুদের দায়িত্ব কি শুধু ঘর দেওয়া?

সিডর-আইলা থেকে শুরু করে পরবর্তী দুর্যোগগুলোতে বহু মানুষ বসতভিটা হারিয়েছেন। তারা এক অর্থে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছেন।

তাদের পুনর্বাসনের জন্য ঘর নির্মাণ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু ঘরের পাশাপাশি প্রয়োজন—

কর্মসংস্থান সৃষ্টি;
লবণাক্ত জমি পুনর্বাসন;
সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা;
স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা;
শিশুদের শিক্ষার সুযোগ;
নারীদের আয়মূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা;
দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ;
সুন্দরবননির্ভর মানুষের জন্য বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা।
ত্রাণের ফটোসেশন নয়, প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি

দুর্যোগের পর মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানবিক দায়িত্ব। কিন্তু সরকারি বরাদ্দের ত্রাণ মানুষের হাতে তুলে দিয়ে ব্যক্তিগত প্রচার কিংবা ফটোসেশনের প্রতিযোগিতা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সরকারি অর্থ জনগণের অর্থ। তাই জনগণের জন্য বরাদ্দ করা সহায়তা শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছানোই দায়িত্বশীলতার পরিচয়।

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—শুধু তাৎক্ষণিক প্রচার নয়।

সুন্দরবন হতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির নতুন দুয়ার

সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঢাল, জীববৈচিত্র্যের আধার এবং বিপুল সম্ভাবনার উৎস।

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সুন্দরবনকে পরিকল্পিত, নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনের আওতায় আনা গেলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। এর সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করা গেলে তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।

তবে পর্যটনের নামে সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও কঠোর পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

উপকূল বাঁচাতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন

প্রকৃতির দুর্যোগ বন্ধ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।

তাই উপকূলের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—টেকসই বেড়িবাঁধ, নদী খনন ও নাব্যতা রক্ষা, লবণাক্ততা মোকাবিলা, নিরাপদ পানি, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, বিকল্প কর্মসংস্থান, আধুনিক আশ্রয়কেন্দ্র এবং দ্রুত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা।

প্রতিবছর বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর অর্থ বরাদ্দ করে মেরামত করার চেয়ে আগেই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে সংস্কার করা অনেক বেশি কার্যকর ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই।

শেষ কথা

দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষ দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। চিংড়ি, কাঁকড়া, কুঁচিয়া, মাছ, মধুসহ সুন্দরবন ও উপকূলনির্ভর নানা সম্পদ দেশের খাদ্য ও অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে।

অথচ সেই মানুষগুলোর জীবনই যদি বারবার জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায়, কৃষিজমি যদি লবণাক্ততায় অনুর্বর হয়ে পড়ে, সন্তানদের শিক্ষা ও পরিবারের খাবারের নিশ্চয়তা যদি অনিশ্চিত থাকে—তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা টেকসই, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

উপকূলবাসী করুণা চান না; তারা চান নিরাপদ জীবন, টেকসই বাঁধ, সুপেয় পানি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার।

তাই আজ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি একটাই—

“সরকারি ত্রাণ নয়, টেকসই বেড়িবাঁধ চাই; সাময়িক সহায়তা নয়, স্থায়ী জীবিকার নিশ্চয়তা চাই।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *