বটিয়াঘাটায় পাওয়ার দলিলের জমি বিক্রি হওয়ার পর ফের দলিলের চেষ্টা ১০ হাজার টাকা জরিমানা

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অনিয়মের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির দাবি
সেখ রাসেল, বিভাগীয় ব্যুরো চিফ, খুলনা:

খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পাওয়ার মূলে প্রাপ্ত জমি আগে সম্পূর্ণ বিক্রি করা জমি পুনরায় দলিল করার চেষ্টার অভিযোগে সোহেল খন্দকার (৪৪) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। এ ঘটনায় জমি নিবন্ধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, দলিল যাচাই-বাছাই এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কথিত অনিয়মের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বটিয়াঘাটা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস চত্বরে এ ঘটনা ঘটে। দণ্ডপ্রাপ্ত সোহেল খন্দকার বাগেরহাট সদর উপজেলার কান্দাপাড়া গ্রামের মৃত মোজাদ্দের খন্দকারের ছেলে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, একটি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলের আওতাধীন জমি আগেই সম্পূর্ণ বিক্রি করা হয়েছিল। এরপরও ওই দলিলের সূত্র ধরে পুনরায় জমি দলিল করার চেষ্টা করেন সোহেল খন্দকার। দলিল লেখকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমা দেওয়ার পর যাচাই-বাছাইয়ে বিষয়টি ধরা পড়ে।

এ সময় সাব-রেজিস্ট্রার নাহিদুজ্জামান সজীব তাঁকে আটক করেন এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেন। পরে বেলা পৌনে ২টার দিকে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ফজলে রাব্বী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাঁকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন।

দলিল লেখক সমিতির নেতাদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের অভিযোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে:
এ ঘটনার পাশাপাশি বটিয়াঘাটা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল লেখক সমিতির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে অনিয়মের মাধ্যমে দলিল সম্পাদনের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী চক্র সাব-রেজিস্ট্রারের নাম ব্যবহার করে কিংবা তাঁর সরলতার সুযোগ নিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে দলিল সম্পাদনের চেষ্টা করছে। এতে সাধারণ দলিল লেখকদের কাজের সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং জমি নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের শনাক্ত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। দলিল লেখক সমিতির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে সাধারণ লেখকবরা মুখ খুলতে সাহস না পেলেও অনেক সময় পরিচয় গোপন রেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাছাড়া নামের বানানে সমস্যা থাকলে তো কোন কথায় নেই। বিভিন্ন মহল সুযোগ খোজে কিভাবে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া যায়, তেমনি সাব রেজিস্ট্রারদেরও উৎকোচ গ্রহনের একটি মাধ্যম।

প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর দাবি:
জমি মানুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাই জমি নিবন্ধনে কোনো ধরনের জালিয়াতি, প্রতারণা কিংবা প্রভাবশালী চক্রের দৌরাত্ম্য সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ও আইনি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সচেতন মহলের মতে, বটিয়াঘাটা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল সম্পাদনের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা জরুরি। এ জন্য উপজেলা প্রশাসন, জেলা রেজিস্ট্রার ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশেষ করে—
আগে বিক্রি করা জমি পুনরায় দলিল করার চেষ্টা প্রতিরোধে পূর্ববর্তী দলিল ও মালিকানা যাচাই জোরদার করা।
কথিত সিন্ডিকেট ও অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা।
দলিল লেখক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা যাচাই করে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।
সাধারণ দলিল লেখক ও জমির মালিকদের জন্য হয়রানিমুক্ত, স্বচ্ছ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কার্যক্রমে নিয়মিত প্রশাসনিক তদারকি ও অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা চালু রাখা।

বটিয়াঘাটার এ ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তিকে জরিমানা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে, জমি নিবন্ধন ব্যবস্থার সম্ভাব্য দুর্বলতা চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলোর বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয় এবং সাধারণ মানুষের জমি ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *