গাজীপুর–টাঙ্গাইল মহাসড়কে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, উত্তাল শিল্পাঞ্চল ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে সড়ক অবরোধ, আহত অন্তত ৩০; বন্ধ ৬০ কারখানা, যান চলাচলে ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের নাওজোর, মৌচাক ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভোগড়া এলাকাতেও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এসব ঘটনায় পুলিশ ও শ্রমিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিপেটা করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলা এ আন্দোলনে দুই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অন্তত ৬০টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। শিল্পাঞ্চলে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে শিল্প পুলিশ।

মজুরির দাবিতে সড়কে শ্রমিক:
শ্রমিক ও শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর নাওজোর এলাকায় প্যানিসিয়া লিমিটেডের শ্রমিকেরা কারখানা থেকে বেরিয়ে ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের উড়ালসড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে তাঁরা মহাসড়ক অবরোধ করলে দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

একই সময়ে কোনাবাড়ীর বে-ফুটওয়্যার, মৌচাক এলাকার পূর্বাণী এবং তেলিচালা এলাকার লগোস অ্যাপারেলস ও এটিএস অ্যাপারেলসের শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে বিক্ষোভে যোগ দেন।

পরে পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। এতে শ্রমিকেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান এবং প্রায় আধা ঘণ্টা পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

ভোগড়ায় টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ:
অন্যদিকে, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভোগড়া এলাকায় কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করলে একপর্যায়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। প্রায় তিন ঘণ্টা পর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

৬০ কারখানায় ছুটি, সাতজন গ্রেপ্তার:
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানান, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অন্তত ৬০টি কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করেছে। নাশকতার অভিযোগে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কারখানার শ্রমিক নন।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, নাওজোর ও ভোগড়া এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয়। তবে আলোচনার মধ্যে হঠাৎ ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পদক্ষেপ নিতে হয়।

আন্দোলনের পঞ্চম দিনে নতুন উত্তেজনা:
শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুরের চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক, সফিপুর ও কোনাবাড়ীসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

এর আগে ৩১ অক্টোবর গাজীপুরের ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কে শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হন। ওই ঘটনায় পুলিশের গাড়িসহ ১৫টি যানবাহন ভাঙচুরের খবর প্রকাশিত হয়। ১ নভেম্বর শ্রমিকদের বিক্ষোভের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।

৪ নভেম্বরও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাছা, সাইনবোর্ড ও আশপাশের এলাকায় শ্রমিকদের অবস্থানের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে শিল্পাঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ:
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের বড় চাহিদা রয়েছে। এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, উদ্যোক্তা এবং সরবরাহকারী যুক্ত।

এ অবস্থায় শ্রমিক অসন্তোষ, মহাসড়ক অবরোধ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয় ও শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।

তবে বর্তমান আন্দোলনের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কোনো নির্দিষ্ট ক্রয়াদেশ বাতিল বা রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য এখনো নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি।

সমাধানের পথ কোথায়?
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি, কারখানার উৎপাদন সচল রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার মধ্যে সমন্বয় এখন বড় চ্যালেঞ্জ। শ্রমিকদের দাবিদাওয়া নিয়ে মালিকপক্ষ, সরকার ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

একদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও ন্যায্য মজুরির প্রশ্ন, অন্যদিকে দেশের রপ্তানি আয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান—দুই বিষয়ই বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা না গেলে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *