বাসের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে হারিয়ে যায় ঝিনাইদহের রেল
সাইফুল ইসলাম, ঝিনাইদহ সংবাদদাতা-
একসময় ঝিনাইদহের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল রেল। ১৯১৩-১৪ সালের দিকে ঝিনাইদহে রেলগাড়ি চলাচল শুরু হলেও মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে যশোর-ঝিনাইদহ রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, রেলের সঙ্গে কম ভাড়ার বাসের তীব্র প্রতিযোগিতাই শেষ পর্যন্ত এই রেলপথ বন্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার দিগনগর ইউনিয়নের হড়রা গ্রামের কেশব চন্দ্র পাল ছিলেন সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী ও মোটর পরিবহন ব্যবসায়ী। তাঁর উদ্যোগ ও ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের কারণে তিনি আজও ঝিনাইদহবাসীর কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
কেশব চন্দ্র পাল ১৮৮৩ সালে হড়রা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা রামচরণ পাল এবং মা উষারানী পাল। তিনি দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। পরবর্তীতে তিনি মোটর পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত হন। ব্যবসার প্রয়োজনে শৈলকুপার বেণীপুর বাজার থেকে আগুনিয়াপাড়ায় ব্যবসা স্থানান্তর করেন। পরিশ্রম ও ব্যবসায়িক দক্ষতায় তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হন।
এদিকে খাজুরা গ্রামের মুন্না নাথ ‘জে. জে.’ অর্থাৎ যশোর-ঝিনাইদহ রেল কোম্পানি নামে একটি লিমিটেড কোম্পানি গঠন করে রেলপথ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। ১৯১৩-১৪ সালের দিকে ঝিনাইদহে রেলগাড়ি চলাচল শুরু হয়।
কিন্তু ১৯৩৫ সালের দিকে কালীগঞ্জের কয়েকজন ব্যবসায়ী ‘বাস সিন্ডিকেট কোম্পানি’ গঠন করে যশোর-ঝিনাইদহ বাস সার্ভিস চালু করেন। একই সময়ে ‘পাল’ ও ‘কুরি’ কোম্পানির বাসও সড়কে চলাচল শুরু করে। রেললাইনের পাশাপাশি বাস চলাচল করায় যাত্রী পরিবহনে শুরু হয় তীব্র প্রতিযোগিতা।
রেলগাড়ির গতি ছিল তুলনামূলক ধীর। অন্যদিকে বাস কম ভাড়ায় দ্রুত যাত্রী পরিবহন করতে থাকায় ধীরে ধীরে বাসের দিকে যাত্রীদের আগ্রহ বাড়তে থাকে। ফলে যাত্রী হারিয়ে রেল কোম্পানি আর্থিক লোকসানে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৩৬ সালের দিকে লোকসানের কারণে জে. জে. কোম্পানির যশোর-ঝিনাইদহ রেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
তবে দেশ বিভাগের পরও কেশব চন্দ্র পাল কোম্পানির বাস চলাচল অব্যাহত ছিল। ঝিনাইদহের পরিবহন ব্যবসায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এভাবেই ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
শুধু ব্যবসায়ী হিসেবেই নয়, শিক্ষানুরাগী হিসেবেও কেশব চন্দ্র পালের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৬০ সালে তিনি কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য ৫৩ শতক জমিসহ একটি দ্বিতল ভবন দান করেন। পরবর্তীতে কলেজের জমির পরিমাণ বেড়ে ৯ দশমিক ৩ একরে উন্নীত হয়। তাঁর নামানুসারে প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয় ‘কেশব চন্দ্র কলেজ’, যা সংক্ষেপে ‘কে.সি. কলেজ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৮০ সালে কলেজটি সরকারি করা হয়।
ঝিনাইদহ শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজও কেশব চন্দ্র পালের দানের স্মৃতি বহন করছে। তাঁর দান করা জমি ও ভবনের ওপর প্রতিষ্ঠিত এই কলেজ ঝিনাইদহের উচ্চশিক্ষার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
কে.সি. কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী শিহাব স্মৃতিচারণ করে বলেন, সরকারি হওয়ার পর তিনি কলেজটির প্রথম বিএসসি (পদার্থ, রসায়ন ও গণিত) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হন। তাঁদের ব্যাচ থেকে পাঁচজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
শিহাব বলেন, কেশব চন্দ্র পালের দানের কারণে ঝিনাইদহবাসীর হৃদয়ে তাঁর একটি স্থায়ী আসন তৈরি হয়েছে। উচ্চশিক্ষা বিস্তারের স্মারক হিসেবে শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা কে.সি. কলেজ তাঁর অবদানের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
১৯৬৭ সালে কেশব চন্দ্র পাল পরলোকগমন করেন। তাঁর জীবনের নানা অধ্যায় নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নানা স্মৃতি ও গল্প রয়েছে। তবে ব্যবসা, পরিবহন ও শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদানের পাশাপাশি ঝিনাইদহের রেল যোগাযোগের ইতিহাসের সঙ্গেও তাঁর সময়কাল ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের যোগসূত্র রয়েছে।
রেলপথ বন্ধ হয়ে গেলেও কেশব চন্দ্র পালের রেখে যাওয়া শিক্ষা ও সমাজসেবার স্মৃতি আজও অম্লান। তাঁর দান করা জমি ও প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঝিনাইদহের শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে তাঁর নামকে স্থায়ী করে রেখেছে।##

