বোরকা পরে সাধারণ সেবাগ্রহীতার বেশে ভূমি অফিসে ঢাকার ডিসি ফরিদা খানম
সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক:
ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষ বাস্তবে কী ধরনের সেবা পাচ্ছেন, কোথাও হয়রানি, অনিয়ম কিংবা অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব হচ্ছে কি না—তা সরেজমিনে জানতে এবার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিলেন ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা খানম।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) পরিচয় গোপন রেখে বোরকা পরে সাধারণ সেবাগ্রহীতার বেশে রাজধানীর উত্তরখান ইউনিয়ন ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শনে যান তিনি। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
সাধারণ মানুষের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি ভূমি অফিসের সেবা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন এবং সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা ভূমি-সংক্রান্ত সেবা নিতে গিয়ে কোনো ধরনের ভোগান্তি, হয়রানি বা অতিরিক্ত অর্থ দাবির মুখোমুখি হচ্ছেন কি না—সেসব বিষয়ও জানতে চান তিনি। একই সঙ্গে অফিসের পরিবেশ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ এবং সেবা প্রদানের প্রক্রিয়াও পর্যবেক্ষণ করেন।
পরিদর্শনের একপর্যায়ে নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন ফরিদা খানম। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছভাবে সেবা দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং সেবাগ্রহীতাদের যেন অপ্রয়োজনীয় হয়রানি বা বিলম্বের শিকার হতে না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেন।
প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে এমন আকস্মিক পরিদর্শনের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, পূর্বনির্ধারিত পরিদর্শনে একটি অফিসের স্বাভাবিক চিত্রের বদলে প্রস্তুত করা পরিবেশ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পরিচয় গোপন রেখে সরাসরি সেবাগ্রহীতার অভিজ্ঞতার অংশ হওয়া কর্মকর্তাকে সেবা পাওয়ার বাস্তব প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভিন্ন ধরনের ধারণা দিতে পারে।
ঢাকার প্রথম নারী জেলা প্রশাসক:
ফরিদা খানম শুধু এই আকস্মিক পরিদর্শনের কারণে আলোচনায় আসেননি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তাকে ঢাকার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে ঢাকার ইতিহাসে প্রথমবার একজন নারী এই পদে দায়িত্ব পান।
তিনি ২৫তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার পর রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব নেন। চট্টগ্রামের ২৫২ বছরের প্রশাসনিক ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাখিদের জন্য ‘আকাশ নীড়’ :
প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়েও ফরিদা খানমের উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি ঢাকা জেলা প্রশাসনের ছাদে ‘আকাশ নীড়’ নামে পাখি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য একটি সবুজ পরিসর গড়ে তোলা হয়েছে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (BSS) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আকাশ নীড়ে’ রয়েছে ৫৮ প্রজাতির মোট ৪১৮টি গাছ। এর মধ্যে পাখির খাদ্যের উৎস ও পরাগায়নের জন্য রয়েছে ৩০ প্রজাতির ২২৯টি ফুলের গাছ এবং ১৪ প্রজাতির ৪১টি ফলের গাছ। এছাড়া জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ করতে রয়েছে ১১ প্রজাতির ৪৪টি অলংকারিক গাছ।
পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় ও বিচরণের জন্য সেখানে কৃত্রিম বাসা, জলাধার ও বার্ডস বাথসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ‘আকাশ নীড়’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়।
জনবান্ধব প্রশাসনের বার্তা :
ফরিদা খানমের উত্তরখান ভূমি অফিসে ছদ্মবেশে যাওয়ার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে ঘটনাটির তাৎপর্য শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যতিক্রমী পরিদর্শনে সীমাবদ্ধ নয়; এর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের সরকারি সেবার বাস্তব অভিজ্ঞতা সরাসরি বোঝার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
ঢাকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফরিদা খানম নাগরিক সেবা আরও সহজ ও স্বচ্ছ করতে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন। ‘হ্যালো ডিসি’ নামে একটি অ্যাপ চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, এর মাধ্যমে জেলার মানুষ বিভিন্ন সমস্যা ও অভিযোগ সরাসরি জানাতে পারবেন এবং ভূমি ও প্রশাসনিক সেবার তথ্যও পাওয়া যাবে।
প্রশাসনের বড় কর্মকর্তারা যদি নিয়মিতভাবে মাঠপর্যায়ে গিয়ে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা সরাসরি জানতে পারেন, তাহলে সরকারি সেবার দুর্বল জায়গাগুলো শনাক্ত করা এবং জবাবদিহি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন প্রত্যাশাই এখন সামনে এসেছে।
ছদ্মবেশে একটি ভূমি অফিসে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা নেওয়ার এই উদ্যোগ তাই আলোচনার জন্ম দিয়েছে—প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু অফিসে বসে ফাইল দেখা নয়, প্রয়োজনে সেবাগ্রহীতার জায়গায় দাঁড়িয়ে সেবার বাস্তব চিত্রও দেখা।

