কালীগঞ্জে ভুল চিকিৎসায় প্রসূতির মৃত্যু: ক্লিনিক সিলগালা ও ১ লাখ টাকা জরিমানা, মাতৃহারা নবজাতককে রেখে চিরবিদায় শিল্পী খাতুনের
মশিউর রহমান ঃ
এক বুক আশা আর নতুন অতিথিকে ঘরে তোলার আনন্দ নিয়ে ক্লিনিকে পা রেখেছিলেন ৩৫ বছর বয়সী শিল্পী খাতুন। কোলে আসবে নতুন প্রাণ, ঘর আলো করে হাসবে সন্তান—এই স্বপ্নে বিভোর ছিল পুরো পরিবার। কিন্তু সেই স্বপ্ন মুহূর্তের মধ্যেই রূপ নিল এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ‘নিউ মডার্ন গরীব শাহ ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এ ভুল চিকিৎসা ও চরম অবহেলার বলিকাঁঠে প্রাণ হারাতে হলো এই প্রসূতিকে।
সন্তানের প্রথম কান্নার আওয়াজ শোনার আগেই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন মা। অপারেশনের টেবিল থেকে যখন মায়ের লাশ বের হয়ে এল, তখন চিকিৎসকদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার মাশুল হিসেবে নবজাতক পেল এক নিদারুণ বাস্তবতা—জন্মের প্রথম দিনেই মাতৃহীনতা।
স্বজনদের কান্না আর চরম অবহেলার অভিযোগ
কাষ্টভাঙা ইউনিয়নের সাতগাছিয়া গ্রামের ইয়ার আলীর স্ত্রী শিল্পী খাতুন যখন ক্লিনিকে ভর্তি হন, স্বজনদের দাবি অনুযায়ী তার শারীরিক অবস্থা ছিল একদম স্বাভাবিক। সব পরীক্ষার রিপোর্টও ছিল সন্তোষজনক। কিন্তু অস্ত্রোপচার কক্ষে নেওয়ার পরই ঘনিয়ে আসে অন্ধকার। স্বজনদের অভিযোগ, কাগজে-কলমে অ্যানেশথেসিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. তানভিরুল ইসলামের নাম থাকলেও তিনি দায়িত্বে উপস্থিত ছিলেন না। চিকিৎসকদের চরম ভুল ও অবহেলায় নিভে যায় শিল্পীর জীবনপ্রদীপ।
এমনকি ক্লিনিকের মালিক ইসলাম হোসেন নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ কারবার চালিয়ে আসছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. ফাতিমা আক্তার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, উচ্চ রক্তচাপজনিত তীব্র জটিলতার কারণে রোগী অস্ত্রোপচার কক্ষে আসার আগেই মারা যান।
অভিযানে প্রসূতি মৃত্যুর ক্লিনিক সিলগালা ও ১ লাখ টাকা জরিমানা
ঘটনার তীব্রতায় সোমবার সকালে দ্রুত অভিযানে নামে উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. আমানুল্লাহ আল মামুনের উপস্থিতিতে অনিয়ম ও প্রসূতির মৃত্যুর দায়ে নিউ মডার্ন গরীব শাহ ক্লিনিকটি চিরতরে বন্ধ করে সিলগালা করে দেওয়া হয়। একই সাথে ক্লিনিকটিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং অভিযুক্ত চিকিৎসক ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর জন্য তলব করা হয়েছে।
এক নিঃস্ব নবজাতক ও অনুসূচনার প্রশ্ন
অভিযান শেষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাতৃহীন নবজাতকটির জন্য জামাকাপড়, দুধ ও নগদ ১০ হাজার টাকা তুলে দেওয়া হয় স্বজনদের হাতে। কিন্তু যে শিশুটি মায়ের উষ্ণ স্পর্শ আর মাতৃদুগ্ধের অধিকার নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিল, এক লাখ টাকার জরিমানা কিংবা দশ হাজার টাকা আর কয়েক কৌটা দুধ কি কখনো মিটাতে পারবে তার জীবনের সেই চিরন্তন অভাব? সিলগালা হওয়া ক্লিনিক কিংবা অর্থদণ্ডে কি আর কোনোদিন ফিরে আসবে এক অবুঝ শিশুর মায়ের কোল?
প্রশাসন তদন্ত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু কালীগঞ্জের বাতাস এখন শুধুই এক মাতৃহীন নবজাতকের কান্না আর স্বজনদের ক্ষোভ ও আহাহাকারে ভারী।

