নিষিদ্ধ জুয়া হোটেল পূর্বানীসহ স্পোটিং ক্লাবে জমজমাট,আসরের রক্ষাকবজ নাতি আনোয়ার!
নিজস্ব প্রতিবেদক:
মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের মধ্যেই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলে কয়েকটি ক্লাব ও আবাসিক হোটেলকে ঘিরে নিষিদ্ধ জুয়া ও মাদক ব্যবসার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে! অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ‘নাতি’ আনোয়ার নামে পরিচিত এক ব্যক্তি ও তার কথিত সহযোগীচক্র।
স্থানীয় একাধিক সূত্র ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অভিযোগকারীদের দাবি, মতিঝিলের ঐতিহ্যবাহী ব্রাদার্স ইউনিয়ন, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব এবং হোটেল পূর্বানীর কয়েকটি কক্ষ ঘিরে পর্যায়ক্রমে জুয়া ও মাদককেন্দ্রিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব স্থানে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জুয়ার মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়।
তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
যেসব স্পট ঘিরে অভিযোগ
অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, মতিঝিলের ব্রাদার্স ইউনিয়নের তিনটি কক্ষ, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের চারটি কক্ষ এবং হোটেল পূর্বানীর কয়েকটি নির্দিষ্ট কক্ষকে ঘিরে জুয়া ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব স্থানে সাধারণ ক্লাব কার্যক্রমের আড়ালে ক্যাসিনো-সদৃশ জুয়ার আসর বসে। দিন-রাত বিভিন্ন সময়ে সেখানে বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকাণ্ড চলে আসার অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর অভিযান না হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
“নাতি” আনোয়ারের নাম কেন সামনে?
বিভিন্ন স্থানীয় সূত্রের দাবি, এসব কথিত জুয়া ও মাদককেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ‘নাতি’ আনোয়ারের যোগাযোগ রয়েছে। তার নেতৃত্বে বা নিয়ন্ত্রণে একটি গ্রুপ এসব কার্যক্রম পরিচালনা করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আনোয়ারের সঙ্গে তার ভাই শাকিলসহ প্রায় ১৫ থেকে ২০ জনের একটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। তবে এই গ্রুপের প্রকৃত কর্মকাণ্ড ও সদস্যদের ভূমিকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
যেভাবে ঢাকায় আনোয়ারের উত্থান—অভিযোগ
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুর জেলার আলগী দুর্গাপুর ইউনিয়নের পশ্চিম চর কৃষ্ণপুর এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার প্রায় দুই দশক আগে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় আসেন বলে জানা যায়।
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকায় এসে শুরুতে আরামবাগ স্পোর্টিং ক্লাবের একটি জুয়ার আসরে ছোটখাটো কাজ করতেন তিনি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ক্লাব ও জুয়ার আসরের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয় বলে দাবি করা হচ্ছে।
একপর্যায়ে রাজধানী ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন ক্লাব, আবাসিক ভবন এবং ঢাকা-চাঁদপুর নৌযানকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তার প্রভাব বিস্তার করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘জুয়া-মাদকের সাম্রাজ্য’ গড়ার অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় আনোয়ার তার কথিত জুয়া ও মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক বিস্তার করেন।
রাজধানীর বিভিন্ন ক্লাবের পাশাপাশি আবাসিক ভবন ও অন্যান্য স্থানে তার যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে উঠে আসবে চরিত্রগুলোর সবকিছুই।
বৈধ আয়ের সঙ্গে বিলাসী জীবনযাপনের সামঞ্জস্য কতটা?
অভিযোগ রয়েছে, দৃশ্যমান কোনো বড় ব্যবসায়িক কার্যক্রম না থাকলেও আনোয়ার বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। কেরানীগঞ্জে জমি ও রাজধানীতে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের কথাও বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—তার এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস কী? অভিযোগের সত্যতা থাকলে সম্পদের উৎস, মালিকানা এবং অর্থের প্রবাহ আইনসম্মতভাবে অনুসন্ধান করার দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যের নামে একাধিক সিম ব্যবহারের অভিযোগ
অনুসন্ধানে আনোয়ারের ব্যবহৃত বলে দাবি করা একাধিক মোবাইল নম্বরের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব সিম তার নিজের নামে নিবন্ধিত নয়; বরং বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করা হয়েছে। তবে কোনো সিমের নিবন্ধিত মালিকই যে প্রকৃত ব্যবহারকারী—এমন সিদ্ধান্ত শুধু নিবন্ধন তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া যায় না। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে এসব নম্বরের প্রকৃত ব্যবহারকারী, যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টি তদন্ত করলে আনোয়ারের কথিত যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ?
আনোয়ারের কথিত মোবাইল যোগাযোগ, বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলে কেউ কেউ তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহ করছেন। তবে এটি এখন পর্যন্ত অভিযোগ ও সন্দেহের পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
এ কারণে তার যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন, বিদেশি যোগাযোগ এবং সহযোগীদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের দাবি উঠেছে।
কথা বললেই মামলা ও প্রাণনাশের হুমকি?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কথিত ভুক্তভোগীর অভিযোগ, আনোয়ারের কথিত জুয়া ও মাদক স্পট নিয়ে কেউ কথা বললে তাকে মামলা ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজন প্রতিকারের জন্য প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেছেন বলেও দাবি করেছেন।
তবে হুমকির অভিযোগের সঙ্গে আনোয়ার বা তার সহযোগীদের সরাসরি সম্পৃক্ততা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ করা প্রয়োজন।
প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, যদি সত্যিই মতিঝিলের কয়েকটি ক্লাব ও হোটেলকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে জুয়া ও মাদক ব্যবসার কার্যক্রম চলে থাকে, তাহলে এতদিনেও কার্যকর অভিযান কেন হয়নি?
আরও অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো অভিযানের খবর আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট চক্রের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে তারা অভিযানের আগেই সরে যায় বা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এমন অভিযোগ সত্য কি না, তা খতিয়ে দেখতে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, এসব কথিত জুয়া ও মাদক স্পট থেকে প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তিকে নিয়মিত অর্থ দেওয়া হয়। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে এসব কর্মকাণ্ড চলতে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা নির্দিষ্ট কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগটি সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জুয়া-মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান দাবি
সচেতন নাগরিকদের মতে, জুয়া ও মাদকের বিস্তার শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে কিশোর-তরুণদের বিপথগামী হওয়া, অপরাধ বৃদ্ধি এবং অবৈধ অর্থের প্রবাহের বিষয়টিও জড়িত। তাদের দাবি, শুধু একটি-দুটি অভিযান নয়—অভিযোগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, অর্থের উৎস, কথিত সহযোগী, ক্লাব ও হোটেলকেন্দ্রিক কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন সমন্বিতভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। স্থানীয়দের দাবি, ‘নাতি’ আনোয়ার ও তার কথিত সহযোগীচক্রের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অভিযোগ ওঠা ক্লাব ও হোটেলগুলোতে আইনসম্মতভাবে অভিযান চালানো হোক।
একই সঙ্গে অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহারের অভিযোগ, কথিত জুয়া ও মাদক ব্যবসার অর্থের উৎস এবং আনোয়ারের সম্পদের বৈধতা যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
শেষ কথা
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে জুয়া ও মাদক ব্যবসা নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগ কতটা সত্য, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। অভিযোগ সত্য হলে কারা এর পেছনে রয়েছে, কারা অর্থের যোগান দিচ্ছে এবং প্রশাসনের কেউ এতে জড়িত কি না—নিরপেক্ষ তদন্তেই তার উত্তর মিলতে পারে।

