পুলিশ পরিদর্শক রেজাউলের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পুলিশে কোটি টাকার বদলি বাণিজ্য

স্টাফ রিপোর্টার:
দেশের অন্যতম প্রধান সংরক্ষিত ও স্পর্শকাতর সামরিক ধাঁচের প্রতিরক্ষা এলাকা রাজারবাগ পুলিশ কোয়ার্টারে রাতের আঁধারে বহিরাগত নারী এনে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পুলিশ টেলিকমের পরিদর্শক (নিঃ) মোঃ রেজাউল করিমের (বিপি-৮১০৭১১৫৮৯০) বিরুদ্ধে।
তথ্য সূত্রে, পুলিশ টেলিকম সংস্থায় কর্মরত পরিদর্শক মোঃ রেজাউল করিমের অপকর্মের তালিকায় এই নারী সংক্রান্ত ঘটনায় শুধু সীমাবদ্ধ নয়। পুলিশ টেলিকমে কর্মরত থাকা অবস্থায় কোটি টাকার পুলিশে বদলি বাণিজ্য, যৌন কর্মী সাপ্লাই, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি সাথে জড়িত। একাধিক নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, মাদক ব্যবসায় জড়িত ও সরকারি বাসভবনে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন বলে ভুক্তভোগী পুলিশ সদস্যরা অভিযোগ করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে বহাল তবিয়তে থাকা বিতর্কিত এই কর্মকর্তা রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে ভুক্তভোগী ও ক্ষতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যদের পক্ষ থেকে সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে।
অভিযোগে জানা যায়, পুলিশ টেলিকমের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে পরিদর্শক রেজাউল একটি শক্তিশালী বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। বিশেষ করে ওসি (এমটি) পদে থাকাকালে সাধারণ পুলিশ সদস্যদের ইচ্ছামতো বদলি করে জনপ্রতি ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ থেকে বদলির ক্ষেত্রে ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঘুস আদায় করতেন। পরবর্তীতে তদবির ও কৌশলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ (ROI) পদটিও হাতিয়ে নেন।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিগত সরকারের আমলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশ ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের নাম ভাঙিয়ে অনৈতিক সুবিধা ভোগ করতেন রেজাউল। সেসময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অমান্য করায় তাকে বিভাগীয় শাস্তির মুখেও পড়তে হয়েছিলো। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি রাতারাতি নিজের অবস্থান বদলে বিএনপি পন্থী পরিচয়ে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করেন। যদিও ৫ আগস্টের পর ডিএমপির শিরু মিয়া অডিটোরিয়ামে এক সভায় পুলিশের সাধারণ সমন্বয়কারীরা তাকে চিনতে পেরে ধাওয়া দিয়ে বের করে দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে চরিত্রহীনতার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে পরিদর্শক রেজাউলের বিরুদ্ধে। বর্তমানে স্ত্রী না থাকা সত্ত্বেও রাজারবাগ পুলিশ কোয়ার্টার নিজের নামে বরাদ্দ রেখে সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতেন তিনি।
বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সহযোগি হিসেবে এমটি শাখার বেতার কনস্টেবল সোহাগ সরাসরি তার জন্য নারী সরবরাহের কাজটি পরিচালনা করতেন। এর আগে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় সরকারি গাড়ি অবৈধভাবে ভাড়ায় খাটিয়ে অর্থ উপার্জনের অপরাধে তিনি সাময়িক বরখাস্তও হয়েছিলেন।
গত ১২ আগস্ট ২০২৪ তারিখে ৫ হাজার টাকা ভাড়ায় এক নারীকে স্ত্রী পরিচয়ে কোয়ার্টারে নিয়ে যান রেজাউল। পরদিন সকালে ডিএমপির ১ নম্বর গেটে ওই নারী আটক হলে কনস্টেবল সোহাগ ও স্থানীয় কিছু ব্যক্তির সহায়তায় অনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়।
সম্প্রতি নারী ঘটিত ঘটনায় ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ফোর্স বিভাগের এলপি কোম্পানীর সহ-অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত এসআই- সশস্ত্র,১৮২৫৭ মোঃ শাহাব উদ্দিন (বিপিঃ-৮১০০০১৬৮৪৪) একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর প্রাথমিক বিভাগীয় শাস্তি হিসেবে তাকে গত ২০ আগস্ট ২০২৬ এডিশনাল আইজিপি (টেলিকম) মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে পরিদর্শক রেজাউল করিমকে কেবল ট্রেনিং শাখায় বদলি করা হয়েছে। তবে বাহিনীটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকারী এমন জঘন্য ও প্রশাসনিক অপরাধের ক্ষেত্রে বিভাগীয় মামলা বা বরখাস্ত না করে কেবল দপ্তর পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ সাধারণ পুলিশ সদস্যরা। তবে ভুক্তভোগীরা এটিকে নামমাত্র শাস্তি হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।
এই বদলির আদেশে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পুলিশ সদস্যরাও। সাধারণ সদস্য ও পুলিশের অভিজ্ঞ মহল প্রশ্ন তুলেছেন বদলি কি শুধু কোনো আইনি শাস্তি হতে পারে? একজন কর্মকর্তা যখন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে থেকে কোটি টাকার বদলি বাণিজ্য, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি বাসভবনে অনৈতিক কাজ এবং নারী সরবরাহের মতো গুরুতর অপরাধে লিপ্ত হন, তখন তাকে কেবল এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে বদলি করা অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়ারই শামিল। এতে অপরাধীদের মনে ভীতি তৈরি হওয়ার বদলে বরং উৎসাহ যোগায়।
পুলিশ সদস্যদের দাবি, এই বিতর্কিত পরিদর্শক ও তাঁর সহযোগী কনস্টেবল সোহাগের খুটির জোর বা শক্তির উৎস কোথায় তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। কেবল বদলি দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা না দিয়ে, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে চাকরিচ্যুতির পাশাপাশি ফৌজদারি আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
দেশের প্রচলিত আইন ও চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, রাজারবাগের মতো একটি স্পর্শকাতর ও সরকারি সংরক্ষিত এলাকায় অনৈতিক উদ্দেশ্যে বহিরাগত প্রবেশ করানো এবং অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়া স্পষ্টত গুরুতর অপরাধ। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৪৭ ধারা অনুযায়ী, সংরক্ষিত চত্বরে অনৈতিক উদ্দেশ্যে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ বা অবস্থান করানো সরাসরি
অবৈধ প্রবেশ’ (Criminal Trespass) হিসেবে গণ্য, যার শাস্তি সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদণ্ড বা জরিমানা। এছাড়া একই আইনের ২৯০ ও ২৯৪ ধারায় সরকারি চত্বরে শৃঙ্খলা ও পরিবেশ বিনষ্টকারী অশ্লীল কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং ১০৯ ধারা অনুযায়ী সরকারি পদে থেকে অপরাধে সহায়তা বা প্রভাব খাটিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টার সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অধ্যাদেশ ১৯৭৬-এর ৭৪ ও ৭৬ ধারা মতে, সংরক্ষিত এলাকায় অনৈতিক কাজে নারী সরবরাহ, আশ্রয় প্রদান কিংবা আইন শৃঙ্খলা বিরোধী আচারণ সরাসরি গ্রেফতার ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অন্যান্য সাধারণ অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ যেখানে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে, সেখানে একজন দায়িত্বশীল পরিদর্শকের বিরুদ্ধে এমন অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও অপরাধ দমন না করে কেবল দপ্তর বদল নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
উল্লেখ্য, উক্ত অভিযোগের অনুলিপি অবগতির জন্য পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), অতিরিক্ত আইজিপি (অ্যাডমিন), অতিরিক্ত আইজিপি (টেলিকম) এবং ডিআইজি (অ্যাডমিন)-সহ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিকট পাঠানো হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কঠোর পদক্ষেপ নেন নাকি এই ‘বদলি নাটকেই’ থেমে থাকে বিচার পক্রিয়া?
এ বিষয়ে অভিযুক্ত পরিদর্শক রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মোবাইল ফোনে সংযোগ না পাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *