আদমদীঘির মৎস্য শিল্প এখন দেশের মধ্যে রোল মডেল
আদমদীঘি প্রতিনিধি:
দেশের মৎস্য ভান্ডার হিসেবে খ্যাত পশ্চিম বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা অঞ্চল। বর্তমানে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা মৎস্য সম্পদে গৌরবোজ্জল অবস্থান তৈরি করেছে। পাঙ্গাস মাছ থেকে শুরু করে প্রায় সব প্রকার মাছ চাষ করে আদমদীঘিবাসী মৎস্য উৎপাদনে উর্দ্ধৃত্তের রেকর্ড সৃস্টি করছে। দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের আমিষের চাহিদা পূরুন ও মাছের বাজার স্থিতিশীলতা আনয়নে আদমদীঘি মৎস্য সম্পদের অবদান অনস্বিকার্য।
মাছের জগতে সারা দেশে আদমদীঘি এখন রোল মডেল। আদমদীঘিতে নগরায়ন ও শিল্পায়ন তেমন না হওয়ায় এলাকাবাসী সাধারনত ধান চাষের উপর নির্ভরশীল ছিল। তাছাড়া আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা আধিক হওয়ায় এখানে ধনী শ্রেনীর মানুষের নিম্মহার এবং প্রান্তিক চাষী ও ভূমিহীনদের অধিক হার ছিল। কিন্তু ৮০ দশক থেকে মাছ চাষ সম্প্রসারনের ফলে উভয় শ্রেনীর মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষও মাছ চাষের দরুন বর্তমানে মধ্যবিত্তের কাছাকাছি পর্যায়ে চলে এসেছে। অতীতে এই উপজেলার রক্তদহ ও চলন বিল থেকে মিঠা পানির বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা সংগ্রহ করা হত।
প্রাপ্ত তথ্য সূত্রে জানা যায়, আদমদীঘি উপজেলা সদরের মাঝিপাড়া গ্রামের মনমত সরকার সর্বপ্রথম ১৯৮২ সালে মাঝি পাড়াতে মাছের কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র (হ্যাচারী) গড়ে তোলেন। হ্যাচারী প্রতিষ্টার পর তিনি প্রথমে মিরর কার্প, সিলভার কার্প, রুই ও কাতলার কৃত্রিম প্রদ্ধতিতে পোনা উৎপাদন শুরু করেন। এরপর ১৯৯২ সাল থেকে আদমদীঘিতে পাঙ্গাসের পোনা উৎপাদন শুরু হয়।
আদমদীঘি উপজেলা মৎস্য অফিস সুত্রে জানা যায়, বর্তমানে আদমদীঘি উপজেলায় হ্যাচারীর সংখ্যা ৭০ টির অধিক এবং পুকুর, দিঘীর সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার এবং বাৎসরিক উদ্ধৃত্তের পরিমান প্রায় সাড়ে ৭ কোটিরও বেশি। তবে মাছ চাষীদের মতে এ সংখ্যা আরও বেশি এবং এই উপজেলার পাঙ্গাস দেশের বিভিন্ন জেলায় এবং চোরা পথে ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও যায়। প্রতি বছর এই উপজেলায় রেনু উৎপাদন প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন: পোনা উৎপাদন হয় প্রায় ৫০ মেট্রিক টন: বড় মাছ উৎপাদন হয় প্রায় ৪৫ হাজার মেট্রিক টন। সরকারি মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও শুধু বেসরকারি পর্যায়ে গড়ে উঠেছে প্রায় ৭০টি মৎস্য প্রজনন হ্যাচারী। উপজেলার সান্তাহারে অবস্থিত দেশের বৃহৎ মৎস্য গবেষনা প্রতিষ্ঠান মৎস্য গবেষনা ইনষ্টিটিউট এবং প্লাবন ভূমি উপকেন্দ্র নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে একের পর এক বিলুপ্ত এবং বিলুপ্ত প্রায় দেশীয় ছোট মাছের কৃত্রিম প্রজনন করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে আদমদীঘিতে মৎস চাষে উল্লেখ যোগ্য অবদান রেখে চলেছে স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল মহিত তালুকদার। উপজেলার কালাইকুড়িতে তার একটি বৃহৎ মৎস্য প্রজেক্ট রয়েছে। তিনিই প্রথম এই উপজেলায় চিংড়ি চাষ শুরু করেন। মাছে চাষে বিশেষ অবদান রাখায় তিনি
জাতীয় ভাবে পুরস্কার লাভ করেছেন। এছাড়াও মাছ চাষে বিশেষ অবদান রাখায় রফি আহম্মেদ আচ্চু জাতীয় ভাবে পুরস্কার লাভ করেছেন। অপরদিকে মৎস্য চাষে বিশেষ অবদান রাখায় স্বর্ন বিজয়ী বেলাল হোসেন দেশ সেরা মাছ ব্যবসায়ী হিসাবে পুরস্কার লাভ করেন। প্রতি হেক্টরে ১০০ মেট্রিক টন পাঙ্গাস চাষ করে তিনি দেশ সেরা মৎস চাষী হন। দুটি ফিডস মিল সহ বর্তমানে প্রায় ২০০ একর জলাশয়ে মাছ চাষ করছেন বেলাল হোসেন সরদার। আদমদীঘির কাশিমালা গ্রামে ২টি, পারইল গ্রামে ১টি এবং ঢেকড়া গ্রামে ১টি মাছ চাষের প্রজেক্ট আছে তার এবং এসব মাছ চাষের প্রজেক্টে প্রায় ৩০০ জনের অধিক কর্মচারী কাজ করে। এদিকে মৎস্য ভান্ডার নামে খ্যাত বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় পাতিলে রেনু পোনা বহন করে দশ হাজারেরও অধিক পরিবার অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। অল্প পুঁজি খাঁটিয়ে পাতিলে রেনু পোনা ভরিয়ে মাছ চাষীরা দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁ, ময়মনসিংহ, যশোর, টাঙ্গাইল, ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রাক ও ট্রেনে নিয়ে যান। এ ছাড়াও বিভিন্ন গ্রামে পাতিলে রেনু পোনার ভার কাঁধে বহন করে গ্রামে গ্রামে এই ব্যবসা করে যাচ্ছেন মৎস চাষীরা। বিশেষ করে আদমদীঘিতে মাছ চাষ সম্প্রসারনের ফলে এখানকার আর্থ সামাজিক উন্নয়ন হয়েছে। বেকারত্বের সংখ্যা অনেক কমেছে। পাশাপাশি বেকারত্ব জনিত অপরাধ প্রবনতাও কমেছে। সব মিলে মাছ চাষ কার্যক্রমটি এলাকায় আশীর্বাদ হিসাবে গন্য হচ্ছে।
এ বিষয়ে আদমদীঘি সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার নাহিদ হোসেন জানান, আদমদীঘি উপজেলার মৎস্য খাতের এক অপার সম্ভবনার স্থান। এ উপজেলায় চাহিদার তুলনায় রেনু ও বাজার জাত করনের পোনা মাছ বেশি উৎপাদন হয়। তবে যদি এখানে মৎস্য শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা যায়, তা হলে মৎস্য উৎপাদন রেকর্ড পরিমান বৃদ্ধি পাবে।

