ইতিহাসের বৃহত্তম জানাজায় সম্মানিত খালেদা জিয়া,

সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক: সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজা গতকাল বুধবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জিয়া উদ্যানে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃহত্তম এই জানাজায় জনতার ঢল নেমেছিল। লাখ লাখ মানুষ রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এসেছিল তাদের প্রিয় অভিভাবককে শেষ বিদায় জানাতে। জানাজার ময়দান ছাপিয়ে আশপাশের কয়েক বর্গ কিলোমিটার এলাকা পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, তিন বাহিনীর প্রধানরা, মরহুম খালেদা জিয়ার ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাসহ সর্বস্তরের জনগণ জানাজায় অংশ নেন। অংশ নেন কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি ও ঢাকাস্থ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও। এর আগে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানাজাস্থলে পৌঁছে তারেক রহমানকে সান্ত্বনা জানান।

গতকাল বিকাল ৩টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর পশ্চিম মাথায় খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দুপুর দুইটায় জানাজা অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও আনুষ্ঠানিকতার জন্য এক ঘণ্টার মতো দেরি হয়। জানাজার আগমুহূর্তে খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান তার মায়ের জন্য সবার কাছে দোয়া চান।

বেলা তিনটা তিন মিনিটে নামাজে জানাজা শুরু হয়ে তিনটা পাঁচ মিনিটে শেষ হয়। জানাজা পড়ান বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। দুপুরের আগেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও সংসদ ভবনের সামনের তিনটি মাঠ পরিপূর্ণ হয়ে আশপাশের বিজয় সরণি, খামারবাড়ি, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, শাহবাগ, মোহাম্মদপুর, শুক্রাবাদ, ধানমন্ডি এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। জানাজার সময় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর পথে যে যতদূর অগ্রসর হতে পেরেছেন, সেখানেই জানাজায় দাঁড়িয়ে পড়েন। আসাদ গেট থেকে মোহাম্মদপুর টাউন হল, আগারগাঁও মেট্রো স্টেশন থেকে শ্যামলীর শিশু মেলা, তেজগাঁও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে বাংলামোটর এলাকার সড়কে দাঁড়িয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ জানাজায় অংশ নেন। জায়গা না পেয়ে মেট্রোরেল স্টেশন, আশপাশের বাসাবাড়ির ছাদ থেকেও জানাজায় অংশ নিতে দেখা গেছে অনেককে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ছিল দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জানাজা।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কফিন বহন করেছেন আস-সুন্নাহ ফাউণ্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লা, আলোচিত ইসলামী বক্তা মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।
বাংলাদেশেই নয়, বরং গোটা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের এই বৃহৎ জানাজায় অংশ নেন লাখ লাখ মানুষ। বিশেষ করে কোনো মুসলিম নারীর এটিই সর্ববৃহৎ জানাজা। জানাজায় অংশ নেওয়া জনগণের ভাষ্য, খালেদা জিয়া আমৃত্যু দেশের মানুষের অধিকার আদায়ে যে সংগ্রাম করেছেন, আর তার শেষ বিদায়ে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে ইতিহাসের বৃহত্তম জনসমুদ্র তাকে কৃতজ্ঞচিত্তে শ্রদ্ধা জানালো। জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের মতে, একজন রাজনৈতিক নেতা কতটা জনপ্রিয় ও ভালোবাসার পাত্র হলে এমন হতে পারে, খালেদা জিয়া সে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেলেন। দীর্ঘ ৪৫ বছরে তার রাজনৈতিক লড়াই ও অবদান ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। তিনি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন।
জানাজায় প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, ড. আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান খান, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনসহ সরকারের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান, প্রখ্যাত আইনজীবী ড. কামাল হোসেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম, মহাসচিব হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমদ, যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, এনডিএম’র প্রতিষ্ঠাতা ববি হাজ্জাজ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, এনডিপির চেয়ারম্যান কে এম আবু তাহের, অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা, আমজনতা দলের আহ্বায়ক কর্নেল (অব.) মশিউজ্জামান, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, ফরহাদ মজহার, ড. বদিউল আলম মজুমদার, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী প্রমুখ জানাজায় অংশ নেন।

পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিকও জানাজায় অংশ নেন। এর আগে তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে সহমর্মিতা জানান। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে ভারতের শোকবার্তা তার কাছে হস্তান্তর করেন। এ ছাড়া খালেদা জিয়াকে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ এবং ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিয়নপো ডি এন ধুংগেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, জাপান, জার্মানি, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রায় ৪০টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার এবং বহুপাক্ষিক ও আঞ্চলিক সংস্থার প্রধানরা জানাজাস্থলে উপস্থিত হয়ে খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

সরকারের তরফ থেকে নারীদের জন্যও ধর্মীয় বিধান মেনে জানাজায় অংশ নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়। সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, নূরজাহান বেগম, ফরিদা আখতার এবং খালেদা জিয়ার পরিবারের একাধিক নারী সদস্যসহ অনেকেই জানাজায় অংশ নেন।

এদিকে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মৌলভীবাজার, পাবনা, কুষ্টিয়া, চাঁদপুরসহ দেশের বেশ কয়েকটি জেলার একাধিক স্থানে খালেদা জিয়ার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

টানা ৩৮ দিন চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গত মঙ্গলবার সকাল ছয়টায় খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির এক ধ্রুবতারার প্রস্থান ঘটেছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকাহত জাতি। তার মৃত্যুতে সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করছে। অপরদিকে তার দল বিএনপি পালন করছে ৮ দিনের শোকের কর্মসূচি। খালেদা জিয়ার জানাজার জন্য গতকাল বুধবার সাধারণ ছুটি ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *