বটিয়াঘাটায় গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যু ঘিরে রহস্য, দ্রুত দাহ নিয়ে প্রশ্ন এলাকাবাসীর

সেখ রাসেল, বিভাগীয় ব্যুরো চিফ, খুলনা:
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার কিসমত ফুলতলা পুরাতন ভাটার মোড় সিলিন্দামারী এলাকায় গোবিন্দ বাড়ৈ নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা থেকে ৭টা ২০ মিনিটের মধ্যে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ০৬ নং এজাহার সূত্রে জানা গেছে।

মৃত গোবিন্দ বাড়ৈ ওই এলাকার মৃত হরিপদ বাড়ৈর ছেলে। স্থানীয়দের দাবি, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়ার আগেই মরদেহ দাহের অনুমতি দেওয়া এবং দ্রুত দাহ সম্পন্ন করায় ঘটনাটি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, মৃতের মাথায় আঘাতের চিহ্ন, পুরুষাঙ্গ দিয়ে রক্তপাত এবং মুখ দিয়ে ফেনা বের হওয়ার মতো কিছু আলামত তারা দেখতে পেয়েছেন। তবে এসব বিষয় ময়নাতদন্ত ও চিকিৎসাবিদ্যার আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। এসব আলামত মৃত্যুর কারণ প্রমাণ করে—এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া সম্ভব নয়।

ঘটনাটি নিয়ে আরও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এজাহারে মৃতের কন্যা পূর্বা বাড়ৈ তার পিতাকে শুয়াইয়ে রেখে চলে যাওয়া মাত্র ১০/২০ মিনিটের মধ্যে পুকুর ঘাটে পড়ে থাকা, একাই তার বাবাকে পুকুরঘাট থেকে নিয়ে আসা, মরদেহ আনার পর মৃতের কাপড়ে পানি লাগার বিষয়টি কেন দেখা যায়নি—এ প্রশ্নেরও তদন্ত প্রয়োজন। এমনও আলোচনা হচ্ছে, তার কন্যা পূর্বা বাড়ৈ এর সাথে কারো কোনো প্রেম ঘটিতো সম্পর্কে এমন ঘটনাও ঘটতে পারে, একই সঙ্গে মৃত্যুর আগে তার বাড়ীতে কে কে যাতায়াত করেছে, ঐ দিন তিনি কোথায় কোথায় কি কাজে গিছিলেন, কারো সাথে কোন বিরোধের মত ঘটনা ঘটেছে কিনা, তিনি কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে ছিলেন, কীভাবে অসুস্থ বা আহত হন এবং তাকে উদ্ধার করার সময় উপস্থিত ব্যক্তিরা কী দেখেছেন—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত নিয়ে প্রশ্ন : ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৪ ধারায় আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা, অন্যের দ্বারা হত্যা অথবা এমন কোনো মৃত্যু যেখানে অন্য কারও অপরাধের বিষয়ে যুক্তিসংগত সন্দেহ সৃষ্টি হয়—এসব ক্ষেত্রে পুলিশকে বিষয়টি নিকটস্থ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দ্রুত তদন্ত করবে এবং মরদেহের দৃশ্যমান আঘাত ও মৃত্যুর আপাত কারণ উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করার বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টও ব্যাখ্যা করেছে যে সুরতহাল প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য হলো মৃত্যু সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক কি না এবং দৃশ্যমানভাবে মৃত্যুর আপাত কারণ কী—তা নিরূপণ করা; এটি পূর্ণাঙ্গ অপরাধ তদন্তের বিকল্প নয়। অন্যদিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৬ ধারা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ম্যাজিস্ট্রেট মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পৃথক তদন্ত করতে পারেন। যেহেতু মামলা হয়েছে, তাহলে এত দ্রুত কেন মরদেহ দাহ করা হয়েছে।

তাই গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুর ক্ষেত্রে স্থানীয়দের উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর সত্যতা যাচাই করতে সুরতহাল প্রতিবেদন, ময়নাতদন্তের ফলাফল, ঘটনাস্থলের আলামত, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং প্রয়োজন হলে ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জনমনে প্রশ্ন বিষয়টি ভিন্ন দিকে প্রবাহিত হচ্ছে না তো?

সম্পত্তি নিয়ে প্রশ্ন, তবে উত্তরাধিকার নির্ধারণে আইনগত যাচাই জরুরি: স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করছেন, গোবিন্দ বাড়ৈর উল্লেখযোগ্য সম্পত্তি ছিল এবং তার মৃত্যুতে সম্পত্তির উত্তরাধিকার কারা পাবেন—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ কারণে সম্পত্তি-সংক্রান্ত কোনো বিরোধ ছিল কি না, মৃত্যুর আগে কোনো লেনদেন, দলিল, উইল, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা সম্পত্তি হস্তান্তরের চেষ্টা হয়েছিল কি না—সেটিও তদন্তের প্রয়োজনে যাচাই করা যেতে পারে।

তবে “হিন্দু দায়ভাগা আইন অনুযায়ী সম্পত্তি শুধু ভাই বা ভাইয়ের পুত্র পাবেন”—এমন সরল সিদ্ধান্ত আইনগতভাবে দেওয়া যায় না। উত্তরাধিকার নির্ভর করে মৃত ব্যক্তির বৈবাহিক অবস্থা, সন্তান, মা-বাবা, ভাই-বোন, অন্যান্য উত্তরাধিকারী, উইল এবং প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইনের ওপর। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৩৭ সালের Hindu Women’s Rights to Property Act-এর ৩ ধারায় দায়ভাগা-শাসিত হিন্দু পুরুষের বিধবার সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কে বিধান রয়েছে।

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের দাবি : স্থানীয়দের অভিযোগ, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ পরিষ্কার হওয়ার আগেই দ্রুত দাহ সম্পন্ন হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে থাকতে পারে। কেউ কেউ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। আবার পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করতে অনীহার কথাও এলাকায় আলোচনা রয়েছে; শেষ পর্যন্ত পুলিশের তৎপরতায় মামলা করা হয়েছে—এমন দাবিও স্থানীয়ভাবে শোনা যাচ্ছে।

ময়নাতদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি: গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের প্রশ্ন—মৃত্যুর কারণ নিয়ে যদি সন্দেহ থেকে থাকে, তাহলে ঘটনাস্থলের আলামত, মরদেহের দৃশ্যমান আঘাত, সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্তের ফলাফল যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রকাশের প্রক্রিয়া কী ছিল?

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে—
১. মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর কখন পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়;
২. কখন সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়;
৩. মরদেহ কখন ও কোথায় ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়;
৪. ময়নাতদন্তের চিকিৎসক কী কী আলামত পেয়েছেন;
৫. ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত মতামত কী;
৬. দাহের অনুমতি কোন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এবং কী ভিত্তিতে দেওয়া হয়;
৭. মৃত্যুর আগে ও পরে কারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন;
৮. সম্পত্তি বা আর্থিক লেনদেন নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল কি না;
৯. প্রয়োজনে মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি, কল রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আলামত পরীক্ষা করা হয়েছে কি না।

এলাকাবাসীর দাবি, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত মৃত্যুর কারণ জনসম্মুখে পরিষ্কার করা হোক। প্রয়োজন হলে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে তদন্তে কোনো গাফিলতি বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও তদন্তের ফলাফলই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ, গুঞ্জন বা সম্পত্তি-সংক্রান্ত আশঙ্কার ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে প্রমাণ ও ফরেনসিক তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

প্রতিবেদনের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, পুলিশ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এলাকাবাসীর দাবি—গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুর ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং কোনো অনিয়ম থাকলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *