দুর্গাপুরে সাড়ে ১১ কোটি টাকার সড়ক প্রকল্পে অনুমোদন ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন

সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক:
দুর্গাপুরে সাড়ে ১১ কোটি টাকার সড়ক প্রকল্পে অনুমোদন ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন, ওয়ার্ক অর্ডার ও সাইট অফিসার নিয়োগ ছাড়াই কাজ চালানোর অভিযোগ, নিম্নমানের সামগ্রীর অভিযোগও স্থানীয়দের

রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকার সরকারি সড়ক নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে প্রশাসনিক অনুমোদন, ওয়ার্ক অর্ডার এবং প্রকল্প তদারকি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় নথি পৌঁছানোর আগেই কাজ শুরু এবং সাইট অফিসার (SO) নিয়োগ না করেই নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এম এ ইঞ্জিনিয়ারিং, খিলগাঁও, ঢাকা-এর বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত কারিগরি তদারকি ছাড়া কাজ চলায় নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন তারা।

প্রকল্পে বরাদ্দ প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, দুর্গাপুর উপজেলা মোড় থেকে গগণবাড়িয়া মোড় পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার ৪৯০ মিটার সড়ক পুনর্নির্মাণে বরাদ্দ রয়েছে ১০ কোটি ৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা।

অন্যদিকে গুড়খাই থেকে সিরিপুর পর্যন্ত নতুন প্যাকেজের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১ কোটি ৩৮ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৬৫০ মিটার RCC সিসি ঢালাইয়ের জন্য বরাদ্দ ২২ লাখ ৩০ হাজার টাকা।

অর্থাৎ, বিপুল সরকারি অর্থের এ প্রকল্পে কাজের গুণগত মান, পরিমাপ, উপকরণের মান এবং নিয়মিত কারিগরি তদারকি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ওয়ার্ক অর্ডার ও SO ছাড়াই কাজ?

স্থানীয়দের অভিযোগ, নতুন সিডিউলের রিভাইজড ওয়ার্ক অর্ডার উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে পৌঁছানো এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সাইট অফিসার নিয়োগের পরই সংশ্লিষ্ট কাজ শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এসব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার আগেই প্রায় ২০ দিন ধরে প্রকল্প এলাকায় নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।

এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রয়োজনীয় নথি না পৌঁছালে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত তদারকি কর্মকর্তা নিয়োগ না হলে মাঠপর্যায়ে কাজের অনুমোদন এলো কীভাবে?

আরও প্রশ্ন উঠেছে, তদারকি কর্মকর্তা ছাড়া কাজের পরিমাপ, নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাই এবং প্রকৌশলগত স্পেসিফিকেশন অনুসরণ হচ্ছে কি না—তা নিশ্চিত করছেন কে?

উপজেলা প্রকৌশলীর বক্তব্যে মিলেছে নথি না পাওয়ার তথ্য

বিষয়টি নিয়ে দুর্গাপুর উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ রায়হানুল হক বলেন, “আমি নতুন ওয়ার্ক অর্ডারের সিডিউল কিংবা সাইট অফিসার নিয়োগ সংক্রান্ত অফিশিয়াল কোনো নথি বা চিঠি এখনও পাইনি। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

উপজেলা প্রকৌশলীর এই বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—তার কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় নথি না পৌঁছানোর পরও মাঠপর্যায়ে কাজ চলমান থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে ছিল কি না।

নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছেও তাৎক্ষণিক নিশ্চয়তা মেলেনি

বিষয়টি নিয়ে রাজশাহী জেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আবুল কালাম আজাদ মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিভাইজড সিডিউল ও সাইট অফিসার নিয়োগের বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেননি।

গণমাধ্যমকর্মীর উপস্থিতিতেই তিনি সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তাকে ফোন করে বিষয়টি জানতে চান। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়, ওয়ার্ক অর্ডার দুই দিন আগে প্রস্তুত করা হলেও তখনও সাইট অফিসার নিয়োগ হয়নি এবং নথি অফিসে গিয়ে ই-মেইলে পাঠানো হবে।

এ সময় নির্বাহী প্রকৌশলী আগামী দুই দিনের মধ্যে নিজে প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনের কথা জানান। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, চার দিন পেরিয়ে গেলেও তিনি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যাননি।

সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ

সরেজমিনে অনুসন্ধানের সময় আরও একটি গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের অনিয়ম ও কাজের মান নিয়ে সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

এমনকি এর আগেও কয়েকজন সংবাদকর্মীকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে বিষয়টি নিয়ে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করা হয়েছিল—এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ যাচাই প্রয়োজন।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য কী?

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাইট তদারকির দায়িত্বে থাকা মোঃ মাসুমের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি। পরে দেখা করে কথা বলার কথা জানিয়ে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লিখিত বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে সংযুক্ত করা হবে।

স্থানীয়দের দাবি—কাজের মান যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বিপুল সরকারি অর্থের প্রকল্পে নিয়মকানুন ও কারিগরি মান নিশ্চিত না করে কাজ চালিয়ে গেলে ভবিষ্যতে সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত প্রকল্পটি সরেজমিনে পরিদর্শন করা, নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষা করা, কাজের পরিমাপ ও প্রকল্পের নথিপত্র যাচাই করা এবং অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।

নজরদারি জরুরি

প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকার সরকারি অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই প্রকল্পে ওয়ার্ক অর্ডার, রিভাইজড সিডিউল, সাইট অফিসার নিয়োগ, কাজের পরিমাপ, নির্মাণসামগ্রীর মান এবং বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া—সবকিছুই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে কাজ শুরুর সময় সংশ্লিষ্ট অনুমোদন ও তদারকি ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কি না, কাজের প্রতিটি ধাপ কে তদারকি করেছেন এবং সরকারি অর্থের বিপরীতে বাস্তবে কতটুকু ও কী মানের কাজ হয়েছে—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাব এখন জরুরি।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে নিয়ে দ্রুত তদন্ত করা হবে এবং তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *