“ফাঁদের ক্ষত জয় করে ছয় মাস পর সুন্দরবনে ফিরল বাঘিনী ,, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আবারও সুন্দরবনের রানি”

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন থেকে ফিরে: হরিণ শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে গুরুতর আহত হওয়া একটি বাঘিনী দীর্ঘ ছয় মাস চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যার পর সুস্থ হয়ে আবারও তার প্রাকৃতিক আবাস সুন্দরবনে ফিরে গেছে। রবিবার (১২ জুলাই) দুপুর ১টা ৫ মিনিটে সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের আন্ধারমানিক ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলে বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করা হয়।

বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করার মুহূর্তটি দেখতে সকাল থেকেই আন্ধারমানিকের শ্যালা নদীর তীরে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে। একটি বিশেষ খাঁচায় করে আনা বাঘিনীকে যখন অবমুক্ত করার প্রস্তুতি চলছিল, তখন উপস্থিত সবার দৃষ্টি ছিল খাঁচাটির দিকে। প্রায় ১০ ফুট দীর্ঘ ও ৬ ফুট চওড়া সবুজ রঙের খাঁচার স্লাইডিং দরজা ওপরে তোলার পর প্রথমে কিছুক্ষণ ভেতরেই অবস্থান করে বাঘিনীটি। এরপর ধীরে ধীরে মাথা বের করে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে। আগের রাতে চেতনানাশক প্রয়োগ এবং কয়েক ঘণ্টা আগে জ্ঞান ফেরার কারণে তাকে কিছুটা ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। শুরুতে বাইরে আসতে অনীহা প্রকাশ করলেও কিছু সময় পর খাঁচা থেকে বের হয়ে আসে। পরে পরিচিত ম্যানগ্রোভ বনের দিকে তাকিয়ে দ্রুত বনের ভেতরে মিলিয়ে যায় সে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকির খালসংলগ্ন বনাঞ্চলে হরিণ শিকারিদের পেতে রাখা ছিটকা ফাঁদে আটকা পড়ে বাঘিনীটি গুরুতর আহত হয়। খবর পেয়ে পরদিন বন বিভাগের সদস্যরা ট্রাঙ্কুইলাইজার গান ব্যবহার করে বাঘিনীটিকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে চিকিৎসার জন্য খুলনার বয়রায় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়।

বন বিভাগ জানায়, ফাঁদের রশিতে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে বাঘিনীটির সামনের বাঁ পায়ে প্রায় তিন ইঞ্চি পরিমাণ চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেখানে পচন ধরেছিল। পরে পাঁচ সদস্যের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ ছয় মাস চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে বাঘিনীটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “নিয়মিত চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের ফলে বাঘিনীটি এখন পুরোপুরি সুস্থ এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। এর ওজন বৃদ্ধি পেয়েছে, ক্ষিপ্রতাও বেড়েছে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় দেখা গেছে, এটি এখন নিজেই শিকার ধরে খেতে সক্ষম। বাঘিনীটির বয়স আনুমানিক ৯ থেকে ১০ বছর।”

তিনি আরও জানান, গত ২১ মে বাঘ গবেষক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বন বিভাগের আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সভায় বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বাঘিনীটিকে যেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, সেই এলাকার বনেই পুনরায় অবমুক্ত করা হবে।

রবিবার অবমুক্তকরণ শেষে বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সুস্থ বাঘিনীটি এখন সুন্দরবনের স্বাভাবিক পরিবেশে স্বাধীনভাবে বিচরণ, শিকার ও প্রজনন কার্যক্রমে অংশ নিতে সক্ষম হবে। তাদের আশা, প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরে গিয়ে বাঘিনীটি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বন বিভাগের মতে, সফল চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পর একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে আবারও তার প্রাকৃতিক আবাসে ফিরিয়ে দেওয়া দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *