পার্বতীপুরে জলাবদ্ধতায় হাজার হাজার হেক্টর জমি ধান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি নদী খনন

এম.ইসলাম,পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধিঃ
দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার নলশিসা নদীর জলাবদ্ধতায় হাজার হাজার কৃষকের ইরি-বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। একদিকে ধানক্ষেত ডুবে নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরির চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চাষিরা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একটাই দাবি—দ্রুত নলশিসা নদী খনন।

কৃষকদের অভিযোগ, উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের নলশিসা নদীর দুই পাশে এখনও শত শত বিঘা জমির ইরি-বোরো ধান পানির নিচে নিমজ্জিত রয়েছে। তবে এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি বিভাগের কাছে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের ঝাউপাড়া থেকে শুরু হয়ে ভবানীপুর, রিফুজিপাড়া, ঘুঘুমারি, কালিকাপুর, পূর্বশুকদেবপুর, খলিলপুর সরদারপাড়া ও পাটিকাঘাট হয়ে নবাবগঞ্জ উপজেলার কোরতোয়া আশুড়া বিলে গিয়ে মিলেছে নলশিসা নদী। একসময় এই নদীপথে নৌযোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য চললেও দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় এখন তা মৃতপ্রায়। স্থানীয়দের দাবি, সর্বশেষ ১৯৮০ সালে তৎকালীন হামিদপুর ইউপি চেয়ারম্যান আফছার আলীর সময়ে নদী খনন করা হয়েছিল।

খলিলপুর সরদারপাড়া গ্রামের বর্গাচাষী বিধবা ফাতেমা খাতুন জানান, দুই বিঘা জমির মধ্যে দেড় বিঘা ধান পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। জমিতে এখনও পানি থাকায় ধানের গোড়ায় পচন ধরেছে। জমি বর্গা নিতে ৭০ হাজার টাকা এবং চাষাবাদে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার তো সর্বনাশ হয়ে গেল।”

সস্তাপুর গ্রামের কৃষক রায়হান আলী হেলাল বলেন, “একদিকে ফসল ডুবছে, অন্যদিকে শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। নলশিসা নদী এখন কৃষকদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত নদী খনন জরুরি।”

একইভাবে শান্তনা বেগম, আব্দুল আলিম, ছালেহা বেগমসহ অনেক কৃষক জানিয়েছেন, ধার-দেনা করে চাষাবাদ করলেও এখন ফসল হারিয়ে তারা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। কেউ কেউ অপরিপক্ক ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য সফিকুল ইসলাম সরদার জানান, অন্তত ১৫০ থেকে ২০০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিবছরই নলশিসা নদীর জলাবদ্ধতায় কৃষকদের দুর্ভোগ বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

স্থানীয় কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে শুধু ইরি-বোরো নয়, আমন মৌসুমেও ফসলের ক্ষতি হয়। কৃষকদের মতে, প্রায় ২০ কিলোমিটার নলশিসা নদী খনন করা হলে জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি তিন ফসলি জমি চাষের সুযোগ তৈরি হবে।

হামিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজওয়ানুল হক বলেন, নদী খননের জন্য একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। এমনকি মন্ত্রণালয়েও আবেদন পাঠানো হয়েছে, কিন্তু এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

এদিকে পার্বতীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাজিব হুসাইন বলেন, “হামিদপুর ইউনিয়নের ধানক্ষেত পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। লোক পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহের পর ক্ষতির পরিমাণ জানানো হবে।”

পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাদ্দাম হোসেন জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে নলশিসা নদী খননে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *