পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর রাষ্ট্রীয় সালাম ও দাফনে বাধার অভিযোগে প্রতিবাদ সভা
মোঃ মনিরুল ইসলাম চৌধুরী, পিরোজপুর:
পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সালাম (গার্ড অব অনার) প্রদান ও দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগের প্রতিবাদে জেলা মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মবৃন্দের উদ্যোগে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে প্রতিবাদ সভায় তাঁর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার প্রক্রিয়া, গেজেটভুক্তি এবং মৃত্যুর পর সৃষ্ট বিতর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন বক্তারা।শনিবার (৩১ অক্টোবর) পিরোজপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবনে আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন যুদ্ধকালীন ক্যাম্প কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা ওবায়দুল কবির বাদল। প্রধান বক্তা ছিলেন যুদ্ধকালীন ক্যাম্প কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরদীদা খালেদ রবি। সভা সঞ্চালনা করেন সাবেক জেলা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক সেন্টু।সভায় বক্তব্য দেন পিরোজপুর সদর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ রব্বানী ফিরোজ, আব্দুস সালাম বাতেন ও আব্দুল মান্নান দরাণী, কাউখালী উপজেলার এস এম দুলাল, ভান্ডারিয়া উপজেলার মো. মতিউর রহমান, মঠবাড়িয়া উপজেলার মো. মাহাবুবুর রহমান, জিয়ানগর উপজেলার আব্দুর রশিদ হাওলাদার এবং নাজিরপুর উপজেলার আকরাম খান।এ ছাড়া সভায় সমীর কুমার বাচ্চুসহ বিভিন্ন উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর পর্বে মানিক পশারীর ভাই চাঁন পশারীর বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হয়। চাঁন পশারী অভিযোগ করেছেন, তাঁর ভাই অর্থের বিনিময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন এবং তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না।এ অভিযোগের বিষয়ে সভার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ওবায়দুল কবির বাদল বলেন, চাঁন পশারী কী বলেছেন বা কেন বলেছেন, সে বিষয়ে তাঁরা অবগত নন। এটি তাঁর ব্যক্তিগত বক্তব্য। তবে অভিযোগটির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।সাংবাদিকেরা আরও জানতে চান, মানিক পশারীর মৃত্যুর আট দিন অতিবাহিত হলেও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কোনো সদস্য বা প্রতিনিধি তাঁর কবর জিয়ারত করতে গিয়েছিলেন কি না। এ প্রশ্নের জবাবে নেতারা জানান, তাঁদের কাছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।প্রতিবাদ সভায় প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কে এম হুমায়ুন কবির খোকন তালুকদারের ছেলে ও মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের নেতা নাঈম তালুকদার মানিক পশারীর গেজেটভুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।তিনি বলেন, মানিক পশারী যদি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা না হয়ে থাকেন, তাহলে কারা তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন? কোন তিন সহযোদ্ধার সাক্ষ্য বা সুপারিশের ভিত্তিতে তিনি গেজেটভুক্ত হয়েছেন? বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।তিনি আরও বলেন, গেজেটভুক্তির প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সুপারিশকারীসহ দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।একই সঙ্গে নাঈম তালুকদার বলেন, মানিক পশারী যদি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়ে থাকেন, তাহলে মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় সালাম ও দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগেরও সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের কঠোর বিচারের আওতায় আনতে হবে।তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ বা দলীয় বিভাজনের কারণে কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্মানহানি করা গ্রহণযোগ্য নয়।বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দলের আহ্বায়ক গাজী কামরুজ্জামান শুভ্র বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য বিষয় নয়। তাঁদের সবচেয়ে বড় পরিচয়, তাঁরা দেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রজন্ম ঐক্যবদ্ধ থাকবে।বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেন বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন এবং পিরোজপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কোনো বিভাজন নেই বলে দাবি করেন।প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মানিক পশারী ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হন। তাঁর গেজেট নম্বর ২৯৩২। তবে কী প্রক্রিয়ায় তিনি স্বীকৃতি পেয়েছিলেন, কারা সুপারিশ করেছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে কী তথ্য রয়েছে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।ফলে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সরকারি নথিপত্র যাচাই ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে সভায় মত প্রকাশ করা হয়।এদিকে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন গণমাধ্যমে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ তুলে সভার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ওবায়দুল কবির বাদল একপর্যায়ে অধিকাংশ সাংবাদিককে ‘বট’ বলে মন্তব্য করেন।এতে উপস্থিত সাংবাদিকেরা আপত্তি জানান এবং কাদের উদ্দেশে এ মন্তব্য করা হয়েছে, তা জানতে চান। নির্দিষ্ট করে কারও নাম উল্লেখ করতে না পারায় পরে তিনি মন্তব্যটি প্রত্যাহার করেন এবং সাংবাদিকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।সভায় বক্তারা বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। তবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো অভিযোগ উঠলে তা যথাযথ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করা প্রয়োজন।একইভাবে মৃত্যুর পর কোনো মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সম্মান ও দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠলে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ও দাপ্তরিক নথি যাচাই ছাড়া গেজেটভুক্ত কোনো ব্যক্তিকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আখ্যা দেওয়া সমীচীন নয় বলেও আলোচনায় উঠে আসে।সভায় অংশগ্রহণকারীরা রাজনৈতিক বিভাজন ও ব্যক্তিগত বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা এবং মানিক পশারীকে ঘিরে উত্থাপিত সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য প্রকাশের আহ্বান জানান।

