সিলেটে ট্রাফিকের আটক করা ড্রাম্পিংয়ে কোটি টাকার গাড়ি নষ্ট হচ্ছে, রেকার বাণিজ্যে অতিষ্ট সিলেটবাসী

আবুল কাশেম রুমন,সিলেট প্রতিনিধি: প্রতিদিন সিলেট নগরী সহ মেট্রোএলাকার গুরুত্বপূর্ন পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশের অভিযান, আর এ পুলিশের চেকপোস্টে আটক করা হচ্ছে অটোরিক্সা সিএনজি, মোটরসাইকেল ব্যাটারি চালিত টমটম,রিক্সা সহ বিভিন্ন ধরণের গাড়ি। গাড়িগুলোর কাজপত্র ঠিক থাকার সত্বে দেওয়া হচ্ছে মামলা নতুবা রেকার। অথচ ট্রাফিক পুলিশের দেওয়া মাসিক টোকনের যে গাড়িগুলো চলছে সেগুলো চলাচল গোটা সিলেট শহর ওপেন করে দেওয়া হয়েছে। রিতিমতো ট্রাফিক পুলিশের মামলা ও রেকার বাণিজ্যে অতিষ্ঠ করে তুলেছে সিলেটবাসীকে। বিশেষ করে পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকদের হতে হচ্ছে হয়রাণী শিকার। এ ব্যাপারে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বললে তারা জানান, এটি পুলিশ কমিশনার সাহেবের নির্দেশনা। ওই দোহাই দিয়ে সিলেট ট্রাফিক পুলিশের রেকার বাণিজ্য লাগামহীন বেড়েছে। হয়রণীর শিকার সাধারণ মানুষ।
অপর দিকে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে হাজার হাজার যানবাহন। ঝোপের ভেতর থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে কোনটির অংশ বিশেষ। আবার কোনটির অবস্থা পানিতে ডুবে মরার মতো। এই অবস্থা সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) ট্রাফিক বিভাগের আলমপুরস্থ ‘ড্রাম্পিং ইয়ার্ডের’।
শুধু তাই নয় থানার ডাম্পিংয়ে রাখা যানবাহনের অবস্থা আরও নাজুক। কোনটির ব্যাটারি নেই, কোনটির হেডলাইট খোয়া গেছে। কোনটির গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ গায়েব। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, খোলা আকাশের নিচে যেন সাজিয়ে রাখা হয়েছে যানবাহনের সারি সারি কঙ্কাল।
পুলিশ বলছে, স্থায়ী ডাম্পিং ইয়ার্ড ও শেড না থাকা এবং মামলার তদন্ত ও নিলাম প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সূত্রিতার কারণে জব্দকৃত যানবাহন গুলো যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। স্থায়ী ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মিত হলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে বলে মনে করেন এসএমপি কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদ শামীম।
এসএমপি সূত্র জানায়, ট্রাফিক পুলিশের অভিযানে যেসব যানবাহন জব্দ করা হয় সেগুলো নিয়ে রাখা হয় দক্ষিণ সুরমার আলমপুরস্থ ডাম্পিং ইয়ার্ডে খোলার আকাশের নিচে। আর বিভিন্ন মামলার আলামত হিসেবে জব্দকৃত যানবাহন উন্মুক্ত ভাবে রাখা হয় সংশ্লিষ্ট থানা কম্পাউন্ডের ভেতরে। এতে দিনের পর দিন যানবাহন গুলো খোলা আকাশের নিচে থেকে নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া পুলিশ হেফাজতে থাকাবস্থায় চুরি হয়ে যায় গাড়ি ও মোটরসাইকেলের মূল্যবান যন্ত্রপাতি।
সরেজমিনে আলমপুর ডাম্পিং ইয়ার্ডে দেখা যায়, হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা, টমটম, মোটরসাইকেল ও বিভিন্ন ধরণের গাড়ি খোল আকাশের নিচে পড়ে আছে। পুরো ডাম্পিং ইয়ার্ডে জমে আছে হাঁটুপানি। অযত্ম-অবহেলায় পড়ে থাকার কারণে ঝোপঝাড়ের আড়ালে হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক যানবাহন। কোনটি ডুবতে বসেছে ডাম্পিং ইয়ার্ডে জমে থাকা পানিতে। ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো পড়ে আছে ব্যাটারিবিহীন অবস্থায়। অন্যসব যানবাহনেরও মূল্যবান যন্ত্রাংশ খোয়া গেছে।
ডাম্পিং ইয়ার্ডে অরক্ষিত ভাবে যানবাহন পড়ে থাকা প্রসঙ্গে এসএমপির উপকমিশনার (ট্রাফিক) সুদীপ্ত রায় জানান, ট্রাফিকের হাতে আটক গাড়ি গুলো ডাম্পিংয়ে নেওয়া হলেও আপডেট কাগজপত্র নিয়ে আসলে ছেড়ে দেওয়া হয়। যে কারণে ডাম্পিংয়ে খুব বেশি যানবাহন থাকে না। যেসব যানবাহনের কাগজপত্র নেই সেগুলো এবং ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশাগুলো অনেক দিন থেকে পড়ে আছে। শেড না থাকায় বাধ্য হয়ে খোলা আকাশের নিচে যানবাহন রাখতে হয় বলেই এগুলো কিছুটা নষ্ট হচ্ছে।
এদিকে, থানার ভেতর উন্মুক্ত ভাবে রাখা যানবাহন গুলোর অবস্থা ডাম্পিং ইয়ার্ডের চেয়েও নাজুক। চোরাইপণ্য বা মাদকসহ জব্দকৃত কিংবা দুর্ঘটনার শিকার যানবাহন গুলো মামলার আলামত হিসেবে থানার ভেতর অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে বছরের পর বছর। তদন্ত শেষে বা আদালতের নির্দেশে যখন মালিকরা নিতে আসেন তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা পান যানবাহনের ‘কঙ্কাল’। থানায় থাকাবস্থায় গায়েব হয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ। আর যেসব যানবাহন আদালতের নির্দেশে নিলাম হয়, সেগুলোও মুলত বিক্রি হয় স্ক্র্যাপ হিসেবে।
চলতি মাসে কয়েকটি মোটরসাইকেলের নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। নিলামে একেকটি মোটরসাইকেলের দাম ওঠে ৩-৫ হাজার টাকা। নিলামে অংশ নেওয়া সোহেল আহমদ নামের এক ব্যক্তি জানান, একটি মোটরসাইকেলের দাম চাওয়া হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। কিন্তু ওই বাইকের বেশিরভাগ যন্ত্রাংশই নেই। তাই তিনি দাম হেঁকেছেন ৩ হাজার। বাইকটি ভাঙাড়ির দোকানে বিক্রি করা ছাড়া অন্য কোন কাজে আসবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জব্দকৃত যানবাহন নষ্ট হওয়া প্রসঙ্গে এসএমপি কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদ শামীম জানান, যে পরিমাণ গাড়ি জব্দ আছে সেগুলো রাখার মতো এসএমপির ডাম্পিং ইয়ার্ড নেই। সাময়িক ভাবে দুটি স্থানে রাখা হচ্ছে। স্থায়ী ডাম্পিং ইয়ার্ড করা গেলে যানবাহন গুলো ভালোভাবে সংরক্ষণ করা যেত। তখন স্থায়ী শেড নির্মাণও সম্ভব হতো। এ নিয়ে সিটি করর্পোরেশনের সাথে কথা চলছে। খোলা আকাশের নিচে যানবাহন রাখলে কিছু নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক উল্লেখ করে কমিশনার বলেন, অস্থায়ী ডাম্পিং ইয়ার্ডের চারদিকে সিসি ক্যামেরা লাগানো সম্ভব হলে নিরাপত্তা আরও জোরদার হতো। পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে এরপরও কিছু যানবাহনের যন্ত্রাংশ খোয়া যায়- এটা সত্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *