বটিয়াঘাটায় ধন্যাঢ্য গোবিন্দ বাড়ৈ হত্যা: এজাহারের সময়ের অসঙ্গতি, রহস্য পুকুরঘাটে—তদন্ত কোন দিকে?
সেখ রাসেল, বিভাগীয় ব্যুরো চিফ, খুলনা
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলা সদরের অদূরে ছিলিন্দামারী গ্রামের ধনাঢ্য ব্যক্তি গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলা ঘিরে নানা প্রশ্ন ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী পলি মল্লিক বাদী হয়ে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বটিয়াঘাটা থানায় মামলা করেন। মামলার নম্বর ০৬/২৬।
মামলা দায়েরের পর থেকেই স্থানীয়ভাবে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিশেষ করে এজাহারে বর্ণিত ঘটনার সময়, নিহতকে পুকুরঘাট থেকে ঘরে আনার বিষয় এবং ঘটনার আগে-পরে পরিবারের সদস্যদের গতিবিধি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এসব প্রশ্নের কোনোটি এখনো আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে প্রমাণিত নয়। ফলে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে পুলিশের তদন্ত ও ফরেনসিক/ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এজাহারের সময় নিয়ে প্রশ্ন
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, নিহত গোবিন্দ বাড়ৈর মেয়ে পূর্বা বাড়ৈ সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাবাকে বিছানায় শুয়ে রেখে মামার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। এরপর কিছুদূর যাওয়ার পর তিনি আবার পিতৃগৃহে ফিরে আসেন এবং এজাহার অনুযায়ী সময় উল্লেখ করা হয়েছে সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিট।
ঘটনার এই সময়ের ব্যবধান নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন—মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে তিনি কোথায় গিয়েছিলেন এবং কী কারণে আবার বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন? তিনি বাড়ি ফিরে এসে ঠিক কী পরিস্থিতি দেখতে পান, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পুকুরঘাটে কী ঘটেছিল?
এজাহারে আরও উল্লেখ রয়েছে, পূর্বা বাড়ৈ তার বাবাকে পুকুরঘাট থেকে একাই ঘরে নিয়ে আসেন।
এখানেও কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—গোবিন্দ বাড়ৈ পুকুরঘাটে কীভাবে গেলেন? তিনি সেখানে পড়ে আছেন—এ তথ্য পূর্বা কীভাবে জানতে পারলেন? একজন ব্যক্তি আহত কিংবা অচেতন অবস্থায় থাকলে তাকে একা পুকুরঘাট থেকে ঘরে আনা বাস্তবে কতটা সম্ভব—এ বিষয়টিও তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুরতহাল প্রতিবেদনে আঘাতের চিহ্ন
পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, নিহতের মাথা ও চোয়ালে আঘাতের চিহ্ন ছিল। এছাড়া যৌনাঙ্গ দিয়ে রক্তপাত এবং মুখে ফেনা থাকার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে।
এসব আলামত স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি হত্যাকাণ্ড—এবং হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকলে কীভাবে মৃত্যু ঘটেছে—তা নির্ধারণে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনার পর পুলিশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসে। তাদের মধ্যে পূর্বা, শাকেল ও দেবু নামে কয়েকজনের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচনায় আসে। তবে মামলা দায়ের না হওয়ায় পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
মামলা করতে আগ্রহী ছিলেন না স্বজনরা?
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওসি (তদন্ত) শরিফুল ইসলামের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, নিহতের ঘনিষ্ঠ স্বজনদের কেউ মামলা করতে আগ্রহী ছিলেন না। পরে পুলিশ উদ্যোগ নিয়ে নিহতের স্ত্রীকে দিয়ে মামলা করিয়েছে বলে তিনি জানান।
তদন্তকারী কর্মকর্তার এমন বক্তব্যও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—কেন ঘনিষ্ঠ স্বজনরা প্রথমে মামলা করতে আগ্রহী ছিলেন না? তারা কি ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখছিলেন না, নাকি অন্য কোনো কারণে মামলা করতে অনাগ্রহী ছিলেন?
তবে এ অনাগ্রহের পেছনে কোনো অপরাধমূলক উদ্দেশ্য ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের কোনো যোগসূত্র আছে?
গোবিন্দ বাড়ৈ আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তার একটি মাত্র কন্যাসন্তান ও স্ত্রী রয়েছেন। এছাড়া তার এক ভাতিজা ভারতে বসবাস করেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মৃত্যুর প্রায় এক সপ্তাহ আগে গোবিন্দ বাড়ৈ বিপুল পরিমাণ মূল্যের জমি বিক্রি করেছিলেন। জমি বিক্রির অর্থ, সম্পত্তির মালিকানা এবং মৃত্যুর পর সম্পত্তির উত্তরাধিকার—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তবে জমি বিক্রি এবং হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
‘বিষ প্রয়োগ’ থেকে ‘পুকুরঘাটে ফেলে দেওয়া’—গুঞ্জনের সত্যতা কতটুকু?
ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় নানা ধরনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, খাবারের মাধ্যমে বিষ প্রয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে। আবার কেউ বলছেন, মৃত্যুর পর মরদেহ পুকুরঘাটে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
কিন্তু এসব বক্তব্যের পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে গুঞ্জনকে সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। ময়নাতদন্ত, ভিসেরা পরীক্ষা, ফরেনসিক রিপোর্ট, ঘটনাস্থলের আলামত এবং মোবাইল ফোনসহ ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণেই এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে।
তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি
গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্তকারীদের সামনে এখন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—
১. গোবিন্দ বাড়ৈ শেষবার জীবিত অবস্থায় কার সঙ্গে ছিলেন?
২. সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৭টা ২০ মিনিটের মধ্যে আসলে কী ঘটেছিল?
৩. তিনি কীভাবে পুকুরঘাটে গেলেন?
৪. তাকে পুকুরঘাটে পাওয়া গেলে পুলিশ আসার আগে সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন?
৫. শরীরের আঘাতের চিহ্নগুলো কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে?
৬. মুখে ফেনা ও রক্তপাতের কারণ কী?
৭. খাদ্যে বিষ বা অন্য কোনো বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি ছিল কি না?
৮. মৃত্যুর আগে ও পরে তার মোবাইল ফোনে কার কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল?
৯. সম্প্রতি জমি বিক্রির অর্থ ও সম্পত্তি নিয়ে কোনো বিরোধ তৈরি হয়েছিল কি না?
১০. ঘটনাস্থল, পুকুরঘাট ও বাড়ির আশপাশের সিসিটিভি বা অন্যান্য আলামত পরীক্ষা করা হয়েছে কি না?
এখন নজর পুলিশের তদন্তে
একজন সচ্ছল ব্যক্তির অস্বাভাবিক মৃত্যু, শরীরে আঘাতের চিহ্ন, এজাহারে বর্ণিত সময়ের অসঙ্গতি, পুকুরঘাটে মরদেহ পাওয়ার বিষয় এবং সম্পত্তি-সংক্রান্ত নানা প্রশ্ন—সব মিলিয়ে গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুর ঘটনায় রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে।
তবে প্রকৃত হত্যাকারী কে, হত্যার উদ্দেশ্য কী এবং ঘটনার সঙ্গে পরিবারের কেউ বা অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত শেষ হওয়ার আগে দেওয়া সম্ভব নয়।
এখন মূল প্রশ্ন একটাই—গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যু কি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো অজানা ঘটনা?
তদন্তে যদি সময়ের অসঙ্গতি, ফরেনসিক আলামত, মোবাইল কল রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন এবং সম্পত্তি-সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়, তাহলে মামলার তদন্ত নতুন দিকে মোড় নিতে পারে।
জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে গুঞ্জন নয়—প্রমাণের ভিত্তিতেই তদন্ত এগিয়ে নিতে হবে। এখন দেখার বিষয়, বটিয়াঘাটা থানা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থা কত দ্রুত ঘটনাটির প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে পারে।

