খালের বুকে ভাসমান হাট, চার ঘণ্টায় বেচাকেনা ২৫ লাখ টাকার সবজি নৌকাই দোকান, খালই বাজার | শতবর্ষের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে কচুয়ার গজালিয়ার ভাসমান সবজি হাট | মৌসুমে বেচাকেনা ছাড়ায় ৪ কোটি টাকা
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার:দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের উপকূলেখালের বুকে সারি সারি নৌকা। প্রতিটি নৌকায় থরে থরে সাজানো টাটকা সবজি। কোথাও শসা, লাউ ও করলা; কোথাও চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, ঝিঙে ও বড়বটি। কৃষকের হাঁকডাক আর পাইকারদের দরদামে ভোর থেকেই মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যেই চলে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার সবজি বেচাকেনা। পুরো মৌসুমে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় চার কোটি টাকা।
এটি কোনো সাধারণ হাট নয়। বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের শতবর্ষী ভাসমান সবজি হাট। সপ্তাহের প্রতি রোববার ও বুধবার গজালিয়া খালের ওপর বসে এই ব্যতিক্রমী বাজার। নৌকাই এখানে দোকান, আর খালের বুকই হয়ে ওঠে বাজারের মূল বেচাকেনার স্থান।
শুধু বাগেরহাট নয়, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে নৌকা ও ট্রলার নিয়ে পাইকারি ব্যবসায়ীরা আসেন এই হাটে। কৃষকের জমির টাটকা সবজি নৌপথে সরাসরি পৌঁছে যায় পাইকারদের হাতে; সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন বাজারে।
ভোর হতেই নৌকার সারি
সরেজমিনে দেখা যায়, সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই গজালিয়া খালে শুরু হয় ব্যস্ততা। আশপাশের গ্রামের কৃষকেরা নিজেদের জমিতে উৎপাদিত সবজি নৌকায় করে হাটে নিয়ে আসেন। খালের বিভিন্ন স্থানে নৌকা নোঙর করে শুরু হয় বেচাকেনা।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে নৌকার সংখ্যা। একপর্যায়ে খালের দুই পাড় ও মাঝখানজুড়ে তৈরি হয় নৌকার সারি। কোনো নৌকায় সবজি ওজন করা হচ্ছে, কোনো নৌকায় দরদাম চলছে, আবার কোনো নৌকা থেকে মুহূর্তেই সবজি তুলে নেওয়া হচ্ছে পাইকারি নৌকা বা ট্রলারে।
কৃষকদের কাছে এ হাটের সবচেয়ে বড় সুবিধা—মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি পাইকারের কাছে পণ্য বিক্রির সুযোগ। এতে দ্রুত সবজি বিক্রি হয়ে যায় এবং নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও কমে।
পিরোজপুরের ব্যবসায়ী সালাম হালাদার বলেন, “গজালিয়ার হাটে একসঙ্গে অনেক ধরনের টাটকা সবজি পাওয়া যায়। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি কেনার সুযোগ থাকায় আমরা এখান থেকে বড় পরিসরে সবজি সংগ্রহ করতে পারি। পরে এসব সবজি পিরোজপুরসহ বিভিন্ন এলাকার বাজারে নিয়ে বিক্রি করি।”
বরিশালের ব্যবসায়ী সুলতান শেখ বলেন, “ভোর থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এখানে বড় ধরনের বেচাকেনা হয়। একসঙ্গে অনেক কৃষক সবজি নিয়ে আসেন বলে দ্রুত বড় পরিমাণ পণ্য সংগ্রহ করা যায়। যোগাযোগব্যবস্থা আরও ভালো হলে ব্যবসার পরিমাণ আরও বাড়বে।”
প্রজন্মের পর প্রজন্মের বাণিজ্য
স্থানীয়দের দাবি, শত বছরেরও বেশি সময় ধরে গজালিয়া খালের বুকে এই ভাসমান হাট চলে আসছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কৃষকেরা নৌকায় করে নিজেদের উৎপাদিত সবজি এনে এখানে বিক্রি করছেন।
স্থানীয় কৃষক রাজ্জাক মোল্লা বলেন, “আমরা নিজের জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করি। হাটের দিনে নৌকায় করে সবজি নিয়ে আসি। পাইকাররা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনে নেন। ফলে দ্রুত পণ্য বিক্রি হয়ে যায় এবং পরিবহন খরচও তুলনামূলক কম।”
তবে সম্ভাবনাময় এই হাটে অবকাঠামোগত সংকট রয়েছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, হাটে আসার রাস্তা, নৌকা-ট্রলার ভেড়ানোর ব্যবস্থা এবং পণ্য ওঠানামার পর্যাপ্ত সুবিধা নেই।
সম্ভাবনা আছে, অবকাঠামো নেই
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, হাটটি অনেক পুরোনো এবং এখানে বিপুলসংখ্যক কৃষক ও ব্যবসায়ী আসেন। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থা ও নৌযান নোঙরের সুবিধা পর্যাপ্ত নয়।
তিনি বলেন, “নৌকা ও ট্রলার বাঁধার জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা, যাতায়াতের রাস্তা সংস্কার, পণ্য ওঠানামার সুবিধা এবং বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা গেলে এই হাটের বেচাকেনা আরও কয়েক গুণ বাড়তে পারে।”
অর্থাৎ শতবর্ষী এই বাজারের মূল শক্তি যেখানে নৌপথ ও কৃষকের সরাসরি অংশগ্রহণ, সেখানে দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবকাঠামো ও বাজার ব্যবস্থাপনার ঘাটতি।
মৌসুমে বেচাকেনা ৪ কোটি টাকার বেশি
বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, গজালিয়ার ভাসমান সবজি হাট স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকের উৎপাদিত সবজি দ্রুত পাইকারদের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে যাচ্ছে। এতে কৃষক যেমন বাজার পাচ্ছেন, তেমনি ভোক্তার কাছেও দ্রুত তাজা সবজি পৌঁছাচ্ছে।
তিনি জানান, মৌসুমে এ হাটে চার কোটি টাকার বেশি সবজি বেচাকেনা হয়। তবে হাটটির অবকাঠামোগত কিছু সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিতে সবজি চাষ ও বাজারজাতকরণে আরও সহায়তা দেওয়ার কথা জানান তিনি।
ঐতিহ্য থেকে সম্ভাবনার বাজার
গজালিয়ার ভাসমান সবজি হাট শুধু কৃষিপণ্য কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতি ও বাণিজ্যের এক জীবন্ত ঐতিহ্য। নৌকায় করে কৃষকের পণ্য আসে, নৌকাতেই চলে দরদাম, আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই পণ্য ছড়িয়ে পড়ে একাধিক জেলার বাজারে।
কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, নৌযান নোঙরের ব্যবস্থা, যোগাযোগপথ ও বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা গেলে শতবর্ষী এই ভাসমান হাটের বাণিজ্যিক পরিসর আরও বড় হতে পারে। তখন ঐতিহ্যের এই হাটটি শুধু স্থানীয় কৃষকের বাজার নয়, দক্ষিণাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সবজি বিপণনকেন্দ্র হিসেবেও নতুন পরিচয় পেতে পারে।

