নবজাতকের মৃত্যু, রোগীর শারীরিক ক্ষতির অভিযোগ—চিতলমারীর ক্লিনিক ঘিরে রহস্য! মানববন্ধন ও লিখিত অভিযোগের পর সংবাদ সম্মেলন, ‘ভুল চিকিৎসা নয়’ দাবি পরিচালকের

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার:বাগেরহাটের চিতলমারীতে হাবিবা ক্লিনিক অ্যান্ড বারিশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ঘিরে নবজাতকের মৃত্যু ও এক রোগীর শারীরিক ক্ষতির অভিযোগ নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের প্রতিবাদে এবার সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনাটিকে ‘মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার’ বলে দাবি করেছেন ক্লিনিকটির পরিচালক ছাব্বির আহমেদ রূপম।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টায় ক্লিনিক প্রাঙ্গণে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব দাবি করেন।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—নবজাতকের মৃত্যু কীভাবে হলো? প্রসূতির শারীরিক জটিলতার প্রকৃত কারণ কী? আর অপারেশনের সময় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা কতটুকু?

এসব প্রশ্নের উত্তর এখন নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, চিকিৎসা-সংক্রান্ত রেকর্ড এবং নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর।

নবজাতকের মৃত্যু নিয়ে দুই ধরনের বক্তব্য

ক্লিনিক পরিচালক ছাব্বির আহমেদ রূপম জানান, গত ২৭ জুলাই লাভলী ঘরামী নামে এক নারী সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য তাদের ক্লিনিকে ভর্তি হন। তার দাবি, অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করা হয় এবং ওই নারী একটি শিশুর জন্ম দেন।

পরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটির মুখের তালুতে জন্মগত সমস্যা ছিল এবং সে স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ করতে পারছিল না। জন্মের পর শিশুটি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে গোপালগঞ্জ হাসপাতালে আইসিইউতে পাঠানো হয়। সেখানে সাত দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শিশুটির মৃত্যু হয়।

ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের দাবি, চিকিৎসার ভুলে শিশুটির মৃত্যু হয়নি; বরং জন্মগত জটিলতার কারণে শিশুটির শারীরিক অবস্থা গুরুতর ছিল।

‘মোবাইলের আলোয় অপারেশন’—অভিযোগ কতটা সত্য?

ঘটনাটিকে আরও আলোচনায় এনেছে প্রসূতি লাভলী ঘরামীর কথিত অভিযোগ—বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর মোবাইলের আলো জ্বেলে অপারেশন করা হয়েছিল, যার ফলে তার জরায়ু ও মূত্রনালিতে ক্ষতি হয়েছে।

তবে এ অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ক্লিনিক পরিচালক। তিনি বলেন, ক্লিনিকে একাধিক জেনারেটর রয়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালু করে ক্লিনিকের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ফলে মোবাইলের আলোয় অপারেশন করার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি।

মানববন্ধন ও লিখিত অভিযোগের পর পাল্টা অবস্থান

এর আগে ক্লিনিকটির বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে মানববন্ধন এবং বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করল।

পরিচালক ছাব্বির আহমেদ রূপমের অভিযোগ, একটি ‘কুচক্রী মহল’ পরিকল্পিতভাবে তার প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সুনামের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড করে আসছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

তার অভিযোগ, সাংবাদিকদের কাছে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করে ক্লিনিকটির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের চেষ্টা করা হয়েছে। এ ধরনের অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তিনি।

তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত সত্য

নবজাতকের মৃত্যু এবং প্রসূতির শারীরিক ক্ষতির অভিযোগ—দুটি ঘটনাই গুরুতর। একদিকে রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, অন্যদিকে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সম্পূর্ণ অস্বীকার—দুই বিপরীত বক্তব্যের কারণে বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।

নবজাতকের চিকিৎসা ও মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে হাসপাতালের চিকিৎসা নথি, আইসিইউর কাগজপত্র, অপারেশন নোট, রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একইভাবে প্রসূতির শারীরিক জটিলতার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি ও বিশেষজ্ঞ মতামত প্রয়োজন।

অভিযোগগুলো সত্য নাকি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *