লালমনিরহাটে অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় বখাটেদের হাতে শিক্ষক আরিফুল ইসলামের চিরবিদায়

সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক:
লালমনিরহাটে অনলাইন জুয়া, ক্যাসিনো ও মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে হামলার শিকার সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রভাষক ও ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম (৩৫) আর নেই। দীর্ঘ ২০ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

গত ১ আগস্ট কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত হন শিক্ষক আরিফুল ইসলাম। হামলার পর স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে তাঁর অবস্থার অবনতি হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘদিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর শেষ পর্যন্ত না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি।

আরিফুল ইসলাম লালমনিরহাট সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বাড়ি জেলার আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নে।

জুয়া-মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন আরিফুল : স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শিক্ষক আরিফুল ইসলাম এলাকায় মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন। এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয় একটি জুয়া চক্রের সঙ্গে তাঁর বিরোধের সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এরই জেরে গত ১ আগস্ট বাড়ি ফেরার পথে একদল দুর্বৃত্ত তাঁর ওপর হামলা চালায় বলে পরিবারের অভিযোগ।

অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে গুরুতর আহত অবস্থায় ফেলে রেখে যায়। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

মামলা, গ্রেপ্তার প্রধান আসামি : ঘটনার পর আরিফুল ইসলামের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক বাদী হয়ে আদিতমারী থানায় মামলা করেন। মামলায় রহিদুল ইসলামসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি রহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বাবা হওয়ার আনন্দের আগেই চিরবিদায় : আরিফুল ইসলাম যখন ঢাকার হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন, ঠিক সেই সময় তাঁর স্ত্রী একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। পৃথিবীতে নতুন সন্তানের আগমন ঘটলেও সেই সন্তান বাবার কোলে ওঠার সুযোগ পেল না। সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নেওয়ার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন প্রতিবাদী শিক্ষক আরিফুল ইসলাম।

তাঁর মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন, সহকর্মী ও এলাকাবাসীর মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি : শিক্ষক আরিফুল ইসলামের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হামলা হিসেবে উল্লেখ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

তাঁদের অভিযোগ, অনলাইন জুয়া, ক্যাসিনো ও মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই কি একজন শিক্ষককে জীবন দিতে হলো? একজন শিক্ষকের ওপর এমন নৃশংস হামলার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত জড়িতদের চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হামলার নেপথ্যের কারণ এবং জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে অনলাইন জুয়া, মাদক ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে—যাতে আর কোনো আরিফুল ইসলামকে প্রতিবাদের মূল্য জীবন দিয়ে দিতে না হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *