জয়নগর ইউনিয়নে গ্রামীন সড়ক উন্নয়নে কাগজে-কলমে কাজ, মাঠে কোটি টাকা হরিলুট
হাবিবুল্লাহ বাহার হাবিব
জয়নগর ইউনিয়নে গ্রামীন সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দকৃত টিআর, কাবিখা ও কাবিটা কর্মসূচির আওতায় প্রকল্পের কাজ না করেই বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন ও আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে চেয়ারম্যান বিশাখা তপন সাহার
বিরুদ্ধে।
মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে অধিকাংশ প্রকল্পেই কাজের কোনো বাস্তব চিত্র দেখা যায়নি। বেশিরভাগ প্রকল্পেই কোনো কাজ না করে বরাদ্দের অর্থ তোলা হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে এই প্রতিবেদক একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
কলারোয়া উপজেলায় জয়নগর ইউনিয়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে চলছে জালিয়াতি ও দুর্নীতি। হরিলুট হয়েছে ২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সংস্কারের নামে একাধিক প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দ এলেও অধিকাংশ কাজ বাস্তবে সম্পন্ন হয়নি। অথচ কাগজে-কলমে কাজ দেখিয়ে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,
জয়নগর বেনীপাড়া হতে শ্মশানঘাট অভিমূখে রাস্তা সংস্কার ও শ্বশ্মান উন্নয়ন বরাদ্দ ৪,৭০,০০০ টাকা। একই স্থানের নামে পূর্বেও একাধিকবার বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক সূত্রে জানা যায় যায়, একই স্থানের নাম করে সাতক্ষীরা জেলা পরিষদ থেকে ৩,৭০,০০০ টাকা বরাদ্দ নিয়েছে কিন্তু বাস্তবে কোনো কাজ করেনি। স্থানীয়দের দাবি, বরাদ্দের অধিকাংশই লোপাট হয়েছে।
২৫-২৬ অর্থ বাজেটে ঐ একই স্থানের পুনরায় বাজেট করে চেয়ারম্যান নিজে ঘের ও পুকুরের পাড় মেরামত করে। পুকুরের মাটি প্রায় ৩ লাক টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে।
এছাড়া জয়নগর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝেরপাড়া কালীমন্দির ও মদনমোহন মন্দির সংস্কারের জন্য বরাদ্দকৃত চাল উত্তোলন করে আত্মসাৎ করে অভিযোগকারীর দাবি, সংশ্লিষ্ট মন্দির কর্তৃপক্ষ এ ধরনের কোনো বরাদ্দ পাওয়ার বিষয়ে অবগত নন।
স্থানীয় বাসিন্দা তারক চন্দ্র আঢ্য বলেন, বিশাখা চেয়ারম্যান মন্দিরের সভাপতি সেজে চাল উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছে। সরকারি অর্থে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতি করে আসছে। সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।
তিনি আরো বলেন, আমার পিতা শিবু পদ আঢ্য একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তার মৃত্যুতে জয়নগর উত্তর বেনীপাড়া শ্মশানের পাশে দাফন সম্পন্ন করা হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা
কবর থেকে মাটি কেটে চেয়ারম্যানের নিজস্ব ঘের ও পুকুরের পাড় বেঁধেছে। মাটি কাটা বাধা দিলে বিশাখা অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ সহ জীবন নাশের হুমকি প্রদান করে। ।
গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নের জন্য,
খোদ্দবাটরা এলাকায় সিরাজ মাস্টারের বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত মাটির রাস্তা সংস্কারের জন্য ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও মাত্র অল্প পরিমাণ মাটি ফেলে অধিকাংশ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। একই রাস্তার নামে ভিন্ন প্রকল্প দেখিয়ে পূর্ববর্তী অর্থবছরেও অতিরিক্ত বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যার বরাদ্দের পরিমান ছিলো ২,০০,০০০ টাকা ও ইটির সোলিং করণের বরাদ্দ ১,৩৬,০০০ টাকা। বালি ব্যবহার না করে নিম্ন মানের ইট দিয়ে দায়সারা কাজ করেছে।
২৩-২৪ অর্থ বছরে- মানিকনগর কাটাখালী হতে জয়নগর দাসপাড়া অভিমূখে রাস্তা সংস্কার বরাদ্দ ৪,৪০,০০০ টাকা।
জয়নগর খালপাড় হতে পুরানো গেট অভিমুখে রাস্তা সংস্কার বরাদ্দ ২০৪০০০ টাকা। সেখানে এক ঝুড়ি মাটিও পড়েনি।
জয়নগর মিশন হতে খাল ধার অভিমুখে রাস্তা সংস্কারের বরাদ্দ পরিমান ১,২০,০০০ টাকা।
নীলকন্ঠপুর গফফার মোল্যার বাড়ি হতে গদখালি অভিমুখে রাস্তা সংস্কারের বরাদ্দ ২,০০,০০০ টাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ রাস্তা সংস্কারসহ একাধিক প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ দেখানো হলেও বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি।
খোদ্দবাটরা নুরু রাজের বাড়ি হতে মেম্বারের বাড়ির অভিমুখে রাস্তা ইটির সোলিং করণ। যার বরাদ্দের পরিমান ছিলো ২,০০,০০০ টিকা।
খোদ্দবাটরা বটতলা হতে সিরাজ মাস্টারের বাড়ির অভিমুখে ইটির রাস্তা নির্মাণের বরাদ্দ ছিলো ১,৩৬,০০০ টাকা।
খোদ্দবাটরা মোহনের বাড়ি হতে রহমত মোল্লার বাড়ি অভিমুখে রাস্তা ইটির সোলিং করণ বরাদ্দ ছিলো ৩,৫০,০০০ টাকা।
সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েকটি ইটের রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পেও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, প্রয়োজনীয় বালি না দেওয়া এবং নির্ধারিত প্রস্থের পরিবর্তে কম প্রস্থে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে আলাপ কালে আরো তথ্য উঠে আসে,
জয়নগর সরসকাটি বাজার সংস্কারের জন্য ৩,১০,০০০ টাকা বরাদ্দ হয় কিন্তু বাস্তবে বাজারে কোনো সংস্কার হয়নি।
জয়নগর বসন্তপুর আনারুলের ঘের হইতে জব্বার মোড়লের ঘের অভিমুখে মাটির রাস্তা সংস্কার। যার বরাদ্দের পরিমান ছিলো ৩,৫০,০০০ টাকা। অধিকাংশ ভুতুড়ে প্রকল্পের কাজ গোপন করে সব টাকা আত্মসাৎ করেছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য বলেন, অধিকাংশ প্রকল্পের কাজ চেয়ারম্যান নিজেই নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে পুরো অর্থ আত্মসাৎ করেছে।
সরকারি অর্থ আত্মসাৎ সহ জনগনের ভোগান্তির বিষয়টি সরেজনিতে তদন্তপূর্বক উক্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে, আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনে অনুরোধ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা।
ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক প্রকল্পের মধ্যে সরেজমিন তদন্তে দেখা গেছে, অধিকাংশ রাস্তায় নামমাত্র মাটি ফেলা হয়েছে, যা বর্ষায় ধুয়ে গিয়ে চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। প্রকল্পের প্রতিটি কাজেই রয়েছে অসামঞ্জস্যতা। অসমাপ্ত কাজগুলো গ্রামীণ মানুষের জন্য সুবিধার বদলে বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়নের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নাম ব্যবহার করে বছরের পর বছর সরকারি বরাদ্দ উত্তোলন করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। ফলে জনগণ যেমন সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছে, তেমনি সরকারি অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান বিশাখা তপন সাহার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলে তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর প্রকল্পগুলোর কাজ বুঝে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক বলেন, কাজ না করে কেউ বিল তুলেছে, এটা আমি মানতে পারি না। যাচাই বাছাই শেষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

