ঝিনাইদহে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে ভেটেরিনারি কলেজ—প্রায় সব অবকাঠামোই রয়েছে প্রস্তুত অবস্থায়

সাইফুল ইসলাম ঝিনাইদহ সংবাদদাতা-

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের টেকসই উন্নয়নে ঝিনাইদহে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি নতুন করে জোরালো হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় শিক্ষা, গবেষণা ও ব্যবহারিক অবকাঠামোর প্রায় সব উপাদানই ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে ঝিনাইদহ ভেটেরিনারি কলেজের আশপাশের এলাকায়। ফলে নতুন করে বড় ধরনের বিনিয়োগ ছাড়াই এই ক্যাম্পাসকে কেন্দ্র করে দ্রুত একটি আধুনিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

পূর্বতন ঝিনাইদহ সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ, বর্তমানে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ হিসেবে ঝিনাইদহ ক্যাম্পাসটি পরিচালিত হচ্ছে। ক্যাম্পাসটির নিজস্ব আয়তন ১০.১৭ একর হলেও এর সঙ্গে যুক্ত সাধুহাটি বিএডিসি বীজ উৎপাদন কেন্দ্র এবং সাগান্না বাঁওড়কে অন্তর্ভুক্ত করলে মোট এলাকা ২০০ একরেরও বেশি হয়, যা একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত এই ক্যাম্পাসটি ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকেও অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ঝিনাইদহ শহর থেকে সহজ সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি যশোর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, মাগুরা ও চুয়াডাঙ্গা জেলার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ থাকায় এটি আঞ্চলিক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার উপযোগী স্থান।

বিশেষ করে ভেটেরিনারি কলেজকে ঘিরে গড়ে ওঠা আশপাশের প্রতিষ্ঠানগুলো এই দাবিকে আরও বাস্তবসম্মত করে তুলেছে। এর মধ্যে রয়েছে সাধুহাটি বিএডিসি ফার্ম, সাগান্না বাঁওড়, সরকারি ছাগল উন্নয়ন খামার, হলিধানী রেশম বোর্ড, শহরের কৃষি ইনস্টিটিউট, মৃত্তিকা ইনস্টিটিউট এবং টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে সক্রিয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, মৃত্তিকা ও কৃষিভিত্তিক প্রযুক্তি শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ প্রদান করছে।

ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরেও ইতোমধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অধিকাংশ অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে আধুনিক ল্যাবরেটরি, একাডেমিক ভবন, শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা, গবেষণাগার, ডেইরি, ছাগল ও পোল্ট্রি খামার, ভেটেরিনারি হাসপাতাল, অডিটোরিয়াম, খেলার মাঠ ও জিমনেশিয়াম। পাশাপাশি ফিশারিজ শিক্ষার জন্য উপযোগী জলাশয়ও বিদ্যমান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আধুনিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যে সমন্বিত শিক্ষা ও গবেষণা পরিবেশ প্রয়োজন, তার প্রায় সব উপাদানই ঝিনাইদহে বিদ্যমান। এসব চলমান প্রতিষ্ঠানকে সমন্বয়ের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যেই এখানে আন্তর্জাতিক মানের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, যা এই অঞ্চলের কৃষি গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ডাকবাংলা আঃ রউফ ডিগ্রি কলেজের কৃষি শিক্ষার লেকচারার বলেন—

এটি কোনো ব্যক্তিগত বা আঞ্চলিক স্বার্থের দাবি নয় বরং এটি সময়ের অপরিহার্য প্রয়োজন, উন্নয়নের অগ্রযাত্রার দাবি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ন্যায্য অধিকার।

তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আমাদের জোরালো আহ্বান—দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে এটাকে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও প্রবীণ সাংবাদিক আসিফ ইকবাল কাজল বলেন,

ঝিনাইদহ ভেটেরিনারি কলেজকে কেন্দ্র করে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠার যে বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী উদ্যোগ। আশপাশে যেসব শিক্ষা, গবেষণা ও কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলো সমন্বয় করা গেলে অল্প সময়েই এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা সম্ভব।

ঝিনাইদহ জেলা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি আশরাফুল ইসলাম বলেন, এই অঞ্চলে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুধু একটি দাবি নয়, এটি এখন সময়ের প্রয়োজন। ভেটেরিনারি ক্যাম্পাসসহ আশপাশের বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে সহজেই একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু শিক্ষাখাতই নয়, স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

এ অবস্থায়, ঝিনাইদহবাসী দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে ভেটেরিনারি ক্যাম্পাসকেই পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের জোর দাবি জানিয়েছেন।##

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *