ঝিনাইদহে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তব সম্ভাবনা- বিদ্যমান ভেটেরিনারি অনুষদই হতে পারে পূর্ণাঙ্গ ভিত্তি

সাইফুল ইসলাম ঝিনাইদহ সংবাদদাতা-
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতে সমৃদ্ধ জেলা ঝিনাইদহে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি নতুন করে জোরালো হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধীন ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ (ঝিনাইদহ ক্যাম্পাস)-এ ইতোমধ্যে যে অবকাঠামো ও একাডেমিক সুবিধা গড়ে উঠেছে, তা কাজে লাগিয়েই স্বল্প ব্যয়ে ও অল্প সময়ের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র ঝিনাইদহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, মাগুরা ও যশোর অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তৎকালীন সংসদ সদস্য মশিউর রহমান ঝিনাইদহে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। যদিও নানা সীমাবদ্ধতায় তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি, তবে তার প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত ঝিনাইদহ সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ পরবর্তীতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। সময়ের পরিক্রমায় নানা প্রতিকূলতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি সংকটে পড়লে একে ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ হিসেবে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বর্তমানে এই অনুষদে আধুনিক ল্যাবরেটরি, প্রশস্ত ক্লাসরুম, শিক্ষক-কক্ষ, শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য ডেইরি, ছাগল ও পোল্ট্রি খামার, আধুনিক ভেটেরিনারি হাসপাতাল, মেডিকেল সেন্টার, অডিটোরিয়াম, খেলার মাঠ ও জিমনেশিয়ামসহ একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব অবকাঠামোই বিদ্যমান। পাশাপাশি ফিশারিজ শিক্ষার জন্য উপযোগী আধুনিক পুকুর এবং আশপাশের একাধিক জেলার সঙ্গে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায় এটি একটি আঞ্চলিক উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ঝিনাইদহ শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিক হাদী উজ্জামান (হাদী) বলেন, ঝিনাইদহসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অত্যন্ত প্রয়োজন। ইতোমধ্যে যে অবকাঠামো রয়েছে, সেটিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে খুব অল্প সময়েই এখানে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা সম্ভব।

ঝিনাইদহ কে,সি কলেজের সাবেক প্রফেসর মহব্বত হোসেন টিপু বলেন,এই অঞ্চলের কৃষি গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও মাঠপর্যায়ের সমস্যার সমাধানে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ঝিনাইদহ ক্যাম্পাসে প্রয়োজনীয় অধিকাংশ সুবিধা থাকায় এখানেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে তা দ্রুত কার্যকর ফল দেবে।

ভেটেরিনারি কলেজ অর্থাৎ যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ঝিনাইদহ ক্যাম্পাসের তথ্য অনুযায়ী, এখানে যে ল্যাবরেটরি, ভেটেরিনারি হাসপাতাল এবং ব্যবহারিক শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে, তা দেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনীয়। সরকার যদি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তাহলে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই এটিকে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা সম্ভব।

এদিকে ঝিনাইদহ-২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আলী আজম মোঃ আবুবকর বলেন,ঝিনাইদহে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। বিষয়টি আমি গুরুত্বের সঙ্গে সংসদে আলোচনা করেছি এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আরও আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।

অন্যদিকে, দত্তনগর কৃষি ফার্মকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রস্তাবকে বাস্তবসম্মত নয় বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ বীজ উৎপাদন কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করলে কৃষি উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাছাড়া ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে সেখানে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে।

সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, ঝিনাইদহ ক্যাম্পাসকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে এটি স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এ অবস্থায় এলাকার শিক্ষানুরাগী, সচেতন নাগরিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সরকারের প্রতি দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিদ্যমান অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে ঝিনাইদহে একটি আন্তর্জাতিক মানের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে তা কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই হবে না, বরং পুরো অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে এবং বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের সুনাম আরও বৃদ্ধি করবে।##

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *