বাগেরহাটে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রকল্পে নিয়োগ অভিযোগ তদন্ত কমিটির বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ

বাগেরহাট প্রতিনিধি : বাগেরহাট জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের একটি প্রকল্পে নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন করে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার পদে নিয়োগের ঘটনা ফাঁস হয়ে পড়েছে। জীবিত পিতাকে “শহীদ” বানিয়ে সম্পূর্ণ জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ওই পদে একজনকে চাকুরী দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অপর এক চাকুরী প্রাথীর আবেদনের ভিত্তিতে গঠিত ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটির রহস্যজনক আচরণ ও পক্ষপাতিত্বের কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।
লিখিত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের “ রিভাইটালাইজেশন অব কমিউিনিটি হেলথ কেয়ার ইনিশিয়েটিভস ইন বাংলাদেশ” ( আরসিএইচসিআইবি) প্রকল্পের আওতায় আট শতাধিক পদে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার নিয়োগের জন্য আবেদনপত্র আহবান করা হয়। নিয়োগের শর্তানুসারে প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড বা তার পার্শ্ববর্তী ওয়ার্ডের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে এমন ষ্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও, বাগেরহাট সদর উপজেলার ডেমা ইউনিয়নের সাবেক ২ নং ওয়ার্ডের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার হিসাবে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে নিয়োগ পেয়েছেন কাড়াপাড়া ইউনিয়নের মনিরুল ইসলামের স্ত্রী নাসরিন সুলতানা।
ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি অপর চাকুরী প্রাথী ডেমা গ্রামের মুজিবর রহমানের ছেলে মোঃ মেহেদী হাসান জানতে পেরে, স্থানীয় কতৃপক্ষ বাগেরহাট সিভিল সার্জন অফিসকে জানাতে গেলে কর্তৃপক্ষ আবেদন গ্রহনে তালবাহানা শুরু করে। গত ২০ জুলাই তাকে জানিয়ে দেয়া হয় কর্তৃপক্ষ ওই আবেদন গ্রহন করতে পারবে না। নিরুপায় হয়ে মেহেদী হাসান ২১ জুলাই বাগেরহাট জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ৩০ আগষ্ট বাগেরহাট সিভিল সার্জন অফিসকে মতামত দেয়ার জন্য বলা হয়। বাগেরহাট সিভিল সার্জন বিষয়টি তদন্তের জন্য ডেপুটি সিভিল সার্জন ডাঃ এ.এফ এম. রফিকুল হাসানকে সভাপতি করে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত কমিটির সভাপতি ১৭ সেপ্টেম্বর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ উভয় পক্ষকে তার কার্যালয়ে হাজির হতে বলেন। উভয় পক্ষ হাজির হলেও কমিটির সভাপতি ডাঃ এ.এফ এম. রফিকুল হাসান ব্যস্ততা দেখিয়ে অভিযোগকারী পক্ষের কোন কাগজপত্র গ্রহন করতে অপারগতা প্রকাশ করেন বলে মেহেদী হাসান জানান। পরবর্তিতে ২দিন পর তিনি সিভিল সার্জন বরাবর লিখিত আবেদনের মাধ্যমে কাগজ-পত্র জমা দেন।
মেহেদী হাসান শুক্রবার দুপুরে অভিযোগ করে সাংবাদিকদের বলেন, তদন্ত কমিটির একের পর এক রহস্যজনক আচরণে তিনিসহ এলাকাবাসি বিষ্মিত হয়েছেন। অবৈধ ভাবে চাকুরী নেয়া নাসরিন সুলতানার পক্ষ নিয়ে তদন্ত কমিটি কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এমনকি ৭ অক্টোবর ডেপুটি সিভিল সার্জন ডাঃ এ.এফ এম. রফিকুল হাসান ডেমা এলাকায় তদন্তে যান অভিযুক্ত নাসরিন সুলতানাকে সাথে নিয়ে। এ ক্ষেত্রে অভিযোগকারী না জানলেও, অভিযুক্ত নাসরিন সুলতানা তাঁর সাথে ছিলেন। লোকমুখে জানতে পেরে বাদীসহ তার লোকজন নিয়ে তদন্ত স্থলে গেলে তিনি তাদের সাথে কোন প্রকার কথা না বলে দ্রুত তদন্ত স্থল ত্যাগ করেন।

তিনি অভিযোগ করে জানান, ডেমা ইউনিয়নে নাসরিন সুলতানার কোন নাগরিকত্ব নেই। তিনি কাড়াপাড়া ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা এমন প্রমানপত্রই তিনি নিজে দাখিল করেছেন। তারপরও অজ্ঞাত কারণে এ সব কাগজ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
এদিকে গত ১১ জুন আরসিএইচসিআইবি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব ডাঃ মাখদুমাা নার্গিস স্বাক্ষরিত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার পদে নাসরিন সুলতানার নিয়োগ পত্রে দেখা যায় তার পিতার নাম লেখা আছে শহীদ মোঃ দেলদার হোসেন। ডেমা ইউনিয়নের ভোটার তালিকায় দেলদার হোসেনের নাম পাওয়া গেছে ( ভোটার নং ০১০১৪১২০৫৬০১)। তবে সেখানে ‘শহীদ’ বলে কিছু উল্লেখ নেই ।
অপরদিকে, কাড়াপাড়া ইউনিয়নের ভোটার তালিকায় নাসরিন সুলতানার নাম ঠিকানা পাওয়া গেছে। সেখানে নাসরিন সুলতানার স্বামীর নাম আছে মোঃ মনিরুল ইসলাম ( ভোটার নং ০১০২০৩২৬৬৮৯৬)।
অভিযোগকারী মেহেদী হাসান জানান, নাসরিন সুলতানার এক নিকট আত্মীয় বাগেরহাট স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত। তার প্রভাবে ও তদবিরে তদন্তকারী কর্ত্তৃপক্ষ নাসরিন সুলতানার জাতীয় পরিচয় পত্রে উল্লিখিত ঠিকানা না দেখে পাস কাটিয়ে যাচ্ছেন।
এ বিষয় জানতে চাইলে, তদন্ত কমিটির সভাপতি ডেপুটি সিভিল সার্জন ডাঃ এ.এফ এম. রফিকুল হাসান বলেন, তদন্ত নিয়মানুযায়ী চলছে। খুব শীঘ্রই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। তবে তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যদের নাম জানতে চাইলে, প্রথমে তিনি তাদের নাম প্রকাশ করতে অনীহা প্রকাশ করেন। এক পর্যায়ে বাগেরহাট বক্ষব্যাধী হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডাঃ নজরুল ইসলামের নাম জানালেও, অপর সদস্যের নাম স্মরণ নাই বলে জানান।
অন্যদিকে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটির প্রধান ও ডেপুটি সিভিল সার্জন ডাঃ এ এফ এম রফিকুল হাসান বদলি জনিত কারণে বৃহস্পতিবার দায়িত্ব হস্তান্তর করে এ জেলা থেকে বিদায় নিয়েছেন।

বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডাঃ অরুন চন্দ্র মন্ডল জানান, তদন্ত কমিটি তার কাছে রির্পোট দিলে তিনি তা জেলা প্রশাসকের কাছে প্রেরন করবেন। তবে কতদিনে এ রির্পোট দেয়া হবে তা তিনি জানাতে পারেন নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *